tank

জানা গেছে, বঙ্গোপসাগরের সন্নিকটে দক্ষিণের জেলা পিরোজপুরের সর্বশেষ উপজেলা মঠবাড়িয়া। সমুদ্রঘেঁষা হওয়ায় এই উপজেলার অধিকাংশ এলাকার পানি লবণাক্ত। তাই বসানো যায় না গভীর নলকূপও। বর্ষাকালে পানিতে খুব একটা সমস্যা না হলেও শুকনো মৌসুমে মানুষকে মারাত্মক কষ্ট পোহাতে হয়। দৈনন্দিন কাজকর্ম সারতে তখন একমাত্র অবলম্বন পুকুর এবং ধরে রাখা বৃষ্টির পানি।

জাতীয় সংসদে ঘুষ, দুর্নীতি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে অগ্নিঝরা বক্তব্য দিলেও সেই অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে সাংসদ ডা. রুস্তম আলী ফরাজীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। সাধারণ মানুষের সুপেয় পানির কষ্ট দূর করতে সরকার গেল অর্থবছরে ৪৭ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে মঠবাড়িয়ায় নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে প্রকল্প হাতে নেয়। যেখানে তিন হাজার লিটার বৃষ্টির পানি ধারণক্ষমতার সাত হাজার ৪০০ পানির ট্যাংক ছাড়াও ৩৩টি কমিউনিটি, পাঁচটি পাবলিক টয়লেট, ১০০টি ডিপ টিউবওয়েল, কয়েকটি প্ল্যান্ট এবং পুকুর পুনঃখনন করার কথা। প্রকল্পের প্রতিটি পানির ট্যাংকের জন্য সুবিধাভোগীদের সরকার নির্ধারিত দেড় হাজার টাকা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও অভিযোগ আছে, তাদের গুনতে হচ্ছে পাঁচ-সাত হাজার টাকা পর্যন্ত। বেআইনিভাবে যা স্থানীয় সাংসদের লোকজন নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

গরিবদের ঘরপ্রতি একটি করে ট্যাংক বরাদ্দের কথা থাকলেও খোদ সাংসদের শ্বশুরবাড়িতে তিন-চারটি দেওয়া হয়েছে বলে সরেজমিনে দেখা যায়। ট্যাংক না পেয়ে লবণাক্ত পানি ব্যবহার করে অনেকেই পানিবাহিত রোগে ভুগছেন বলেও জানায় এলাকাবাসী।

স্থানীয় সাংসদের দুর্নীতিবাজ সহযোগীদের কারণে সরকারের এমন মহৎ উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে বলে জানান স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। তাদের অভিযোগ, এমপির লোকজন গরিব মানুষের ট্যাংক তাদের না দিয়ে পাশের উপজেলায় বিক্রি করেছে।

হলতা গুলিশাখালী ইউপি চেয়ারম্যান রিয়াজুল আলম ঝনো বলেন, সুপেয় পানির অভাবে এই অঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হন। বেশি সমস্যা হয় শিশুদের। এই সমস্যা সমাধানে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী ট্যাংক দিয়েছেন। বিতরণে অনিয়মের কারণে এই প্রকল্পের সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। এলাকার মানুষ বলেন, আমরা আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান হয়ে কেন দিতে পারছি না। আমি তখন তাদের বলে দেই, এটি এমপি নিজেই তত্ত্বাবধান করেন।

উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান সিফাত জানান, এমপি’র পিএস হাসান, রঞ্জু, শহিদ- এরাই মঠবাড়িয়ার মানুষের থেকে তিন হাজার, চার হাজার, পাঁচ হাজার এবং সাত হাজার টাকা নিয়ে ট্যাংক বিতরণ করেন। তিনি আরও বলেন, সরকারি এ পানির ট্যাংক পার্শ্ববর্তী বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলায় বিক্রির ঘটনাও রয়েছে।

আরও পড়ুন: বিয়েরদিন পার্লার থেকে ফেরার পথে দুলাভাই-ভাতিজি নিহত, কনে হাসপাতালে

অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেন মঠবাড়ীয়া উপজেলা চেয়ারম্যান রিয়াজ উদ্দীন আহম্মেদও। তিনি বলেন, নিজস্ব লোক দিয়ে বাণিজ্য করে বণ্টন করেন। কিছু ট্যাংক পাশের উপজেলা পাথরঘাটার চরদুয়ানীতে বিক্রি করেছেন। পরে সাতটি ট্যাংক উদ্ধার করেন। আমরা এগুলো উপজেলার মাসিক সভায় উত্থাপন করলেও কোনো প্রতিকার পাইনি।

মঠবাড়িয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হক সেলিম মাতুব্বর বলেন, জাতীয় সংসদে ডাক্তার রুস্তম আলী ফরাজী প্রধানমন্ত্রীর গুণকীর্তন করেন কিন্তু এলাকায় এসে আওয়ামী লীগ নিধন করেন। বিএনপি-জামায়াতের লোকজন দিয়ে উন্নয়ন কমিটি করেন। তাদের থেকে লিস্ট নিয়ে যেখানে তার লোক আছে, সেখানে উন্নয়নমূলক কাজ করেন। অথচ উপজেলা-ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ সড়কের উন্নয়ন করছেন না।

বরগুনা জেলার পাথরঘাটায় বিক্রি করা পানির ট্যাংক ফিরিয়ে আনা হয়েছে বলে স্বীকার করেন সাংসদের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আলী রেজা রঞ্জু। একজনের শ্বশুরবাড়ি পাথরঘাটার চরদুয়ানীতে। সেখানে তারা নিতে চেয়েছিলেন। পরে এমপি নাম কেটে ট্যাংক রেখে দিয়েছেন।

ট্যাংক বিতরণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের কথা শুনেছে বলে জানান, মঠবাড়িয়া জনস্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী আব্দুস সত্তার খান লিটন। তিনি বলেন, আমি মাত্র যোগদান করেছি। এসব অনিয়ম কারা করেছে, তার জানা নেই। এখন অনিয়ম ঠেকাতে তিনি চেষ্টা করছেন।

জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল আলীম গাজী বলেন, এই বিষয়ে তিনি এবং তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এমপির সঙ্গে বৈঠকে কথা বলেছেন। এমপি তাদের আশ্বস্ত করেছেন।

সরকারি ট্যাংক বিতরণে অনিয়মের বিষয়ে জানতে সাংসদ ডা. রুস্তুম আলী ফরাজীকে এক সপ্তাহে একাধিকবার ফোন এবং খুদেবার্তা পাঠালেও তিনি কোনো জবাব দেননি।