bbb

Posted by: | Posted on: August 17, 2021

॥ আনিসুর রহমান ॥
ঢাকা, ১৫ আগস্ট, ২০২১ (বাসস): কয়েক বছর আগেই ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িতদের বিচারকাজ শেষ হয়েছে। এখন পর্যন্ত দোষী সাব্যস্ত বরখাস্তকৃত ১২ সামরিক কর্মকর্তার মধ্যে ছয়জনের ফাঁসি, বিদেশে একজনের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে এবং অন্যরা ফাঁসি এড়াতে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আর
ষড়যন্ত্রের নেপথ্যের খলনায়কদের নিয়ে এখনও জল্পনা কল্পনা চলছে। কিন্তু প্রকাশিত নথিপত্রে জোরালোভাবেই ইঙ্গিত মেলে যে বাংলাদেশের প্রথম সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানই ছিলেন ষড়যন্ত্রের ‘মূল হোতা’।
কিছু সামরিক কর্মকর্তা এমনকি তাদের মধ্যে তৎকালীন সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান জিয়ার খুব কাছের লোক ছিলেন এমনকেউ কেউ বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের খবর তাকে জানানোর পরও তিনি ভাবলেশহীন ছিলেন।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে সরাসরি নেতৃত্বদানকারী বরখাস্ত হওয়া দুই কর্নেল ফারুক রহমান এবং আবদুর রশীদও একইভাবে বলেছেন, জিয়াকে তাদের অভ্যুত্থান পরিকল্পনা সম্পর্কে জানানো হয়েছিল।
বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় একজন অর্থনীতিবিদ এবং পরিকল্পনা কমিশনের তৎকালীন উপ-প্রধান নুরুল ইসলাম তার স্মৃতিকথায় বলেছেন, হত্যাযজ্ঞের কয়েক মাস আগে জিয়া তার সাথে এক বৈঠকে আসন্ন রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের আভাস দিয়েছিলেন। তার ‘মেকিং অব এ ন্যাশন বাংলাদেশ-এন ইকোনমিস্ট’স টেল’ নামক বইতে তিনি বলেছেন, সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি বিদেশ চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করলে জিয়া তার সাথে সাক্ষাত করে তাকে দেশে থেকে যাওয়ার অনুরোধ জানান। ইসলাম তার বইতে আরো উল্লেখ করেন, জিয়া খুবই আস্থাশীল ছিলেন যে অদূর ভবিষ্যতেই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে এবং অনিশ্চয়তা দূর হবে। তিনি আরো লিখেছেন, ‘জিয়ার কথা বলার ধরন দেখে আমি খুবই বিস্মিত হয়েছি। বিশেষ করে ‘অদূর ভবিষ্যত’ এর বিষয়ে তার আস্থা দেখে।’
বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের কয়েক বছর পর সাংবাদিক এন্থনি ম্যাসকারেনহাসকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে ফারুক এবং রশীদ উভয়ে বলেছেন, অভ্যুত্থান সম্পর্কে জিয়া আগে থেকেই জানতেন, এ প্রসঙ্গে বিশেষ করে ফারুক ১৯৭৫ সালের ২০ মার্চ তাদের সাক্ষাতের বিষয়টি তুলে ধরেন।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচারের রায়ের কয়েক বছর পর বাসসের এক সাংবাদিকের সাথে আলাপকালে চাকরিচ্যুত পলাতক প্রধান আসামী আবদুর রশীদের কন্যা মেহনাজ রশীদ আভাস দিয়ে বলেছেন যে জিয়া মূলত তার বাবাকে ব্যবহার করেছেন। মেহনাজ রশীদ বলেন, ‘আমার পিতা এখন একজন খুনী হিসেবে পরিচিত। কিন্তু, কে তাকে ব্যবহার করেছে?’
স্পষ্টত জিয়ার প্রসঙ্গ টেনেই তিনি বললেন, ‘সেই লোকটি তো শেষ পর্যন্ত হিরো হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছেন।’
বাংলাদেশের দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাবলী বিশেষ করে ১৯৭৫ সালের সেনা অভ্যুত্থানের বিষয়ে ব্যাপক অনুসন্ধিৎসু অধ্যয়নের জন্যে পরিচিত বিখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ কয়েক বছর আগে বাসসের সাংবাদিক আনিসুর রহমানের সঙ্গে এক দীর্ঘ ও একান্ত সাক্ষাতকারে জিয়াকে ১৫ আগস্টের ষড়যন্ত্রের ‘নেপথ্যের মূল হোতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ’র সাবেক সাউথ এশিয়া করেসপন্ডেন্ট লিফশুলজ আরো বলেছেন, ‘জিয়ার সুস্পষ্ট সমর্থন ছাড়া আমি মনে করি না এই অভ্যুত্থান এগিয়ে নেয়া যেত।’ সাক্ষাতকারটি ডেইলি স্টার পত্রিকায় ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। এই মার্কিন সাংবাদিক ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের সঙ্গে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র যোগসূত্র খুঁজতে গিয়ে বছরের পর বছর সময় পার করেছেন। তিনি এই লেখকের সঙ্গে সাম্প্রতিক আলাপে তার আগস্ট ১৫, ১৯৭৫: এ লং রোড ইন সার্চ অব দ্য ট্রুথ’ নিবন্ধের প্রসঙ্গ টেনে বলেছেন, এই ষড়যন্ত্রে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার হাত ছিল। ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত নিবন্ধটিতে তিনি নতুন এই দিকের ওপর আলোকপাত করে বলেছিলেন, ‘নতুন এই তথ্য পুরনো তথ্য-উপাথ্য উপাখ্যানে নব অধ্যায়ের সূত্রপাত করলো যা কেবল বাঙালির জন্যেই নয়, আমার মতো আমেরিকানদের কাছেও গুরুত্ববহ। মার্কিন এই সাংবাদিক তার সেই নিবন্ধে বলেছেন, তার সাথে পরিচিত এরকম একজন বাঙালি ব্যবসায়ীকে তিনি জানতেন যিনি অনুরোধের ভিত্তিতে হত্যাযজ্ঞের কয়েকদিন আগে তার বাড়িতে জিয়া এবং তৎকালীন সিআইয়ের স্টেশন চিফ ফিলিপ চেরির মধ্যে বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন। যদিও তিনি তাদের উদ্দেশ্য কিংবা পটভূমি সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। লিফশুলজ লিখেছেন, ‘ঢাকায় কূটনৈতিক মহলে ব্যবসায়ী এই ভদ্রলোকের অনেক বন্ধু ছিল। এই বন্ধুত্ব ও সম্পর্কগুলো তার মালিকানাধীন ও পরিচালিত ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। তিনি আমাকে বলেছেন, মার্কিন দূতাবাসে তার একজন বন্ধু ছিল, যিনি রাজনৈতিক কর্মকর্তা ফিলিপ চেরি।’ লিফশুলজের মতে, ওই ব্যবসায়ীর কোন ধারণা ছিল না যে চেরি দূতাবাসের নিয়মিত কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রদূতের অগোচরে একটি ব্যাকচ্যানেল পরিচালনা করছিলেন।
১৯৭৫ সালের জুলাইয়ের শেষ কিংবা আগস্টের প্রথম দিকে এই কূটনীতিক ওই ব্যবসায়ীকে ডেকে তার বাড়িতে একটি নৈশ ভোজের আয়োজন করার কথা বলেন। তিনি এই প্রস্তাবে রাজি হন এবং চেরি নির্দিষ্ট কিছু অতিথিকে আমন্ত্রণ জানাতে চান কিনা তা জিজ্ঞেস করেন। চেরি সম্ভাব্য এই আয়োজককে বলেন, তিনি কেবল একজন অতিথিকেই আমন্ত্রণ জানাতে চান। তিনি হলেন জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং স্বাভাবিকভাবেই অতিথি তার স্ত্রীকেও নিয়ে আসবেন। যেহেতু ব্যবসায়ী জিয়ার সাথে পরিচিত ছিলেন তাই তিনি সানন্দে রাজি হলেন। যথারীতি নৈশভোজের আয়োজনে উভয় অতিথি তাদের স্ত্রী নিয়ে এসেছিলেন এবং ব্যবসায়ী দম্পতি তাদের স্বাগত জানান।
লিফশুলজ আরো লেখেন, দু’জনই আসার সাথে সাথে এটা স্পষ্ট হলো যে উভয়ের নিজস্ব কিছু আলাপ আছে। তাই, জেনারেল জিয়া ও ফিলিপ চেরি বাগানে গেলেন এবং খাবার পরিবেশনের আগ পর্যন্ত প্রায় একঘন্টা একান্তে কথা বলেন। খাবারের পর উভয়ে আবারো বাগানে যান এবং তাদের আলোচনা চালিয়ে যান। সকলকে তখন খুবই নির্দোষ মনে হয়েছিল।
লিফশুলজ তার লেখায় আরো বলেন, অভ্যুত্থানের পর ওই আয়োজক ও তার পরিবার বুঝতে পারেন তাদেরকে ব্যবহার করা হয়েছে। তারা যে নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন এবং জিয়া ও চেরির বৈঠকটি সামাজিক উদ্দেশ্যে ছিল না। তিনি উল্লেখ করেন, তারা স্পষ্টত বুঝতে পেরেছিলেন অভ্যুত্থানে জিয়ার ভূমিকা ছিল মেজর ফারুক ও মেজর রশীদের দিক থেকে সেনাবাহিনীর চোখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়া কারণ তারা ১৫ আগস্টের ভোরে সুনিদিষ্ট ওই হত্যাকান্ডে অংশ নিয়েছিলেন।
তৎকালীন সেনা প্রধান জেনারেল কেম এম শফিউল্লাহ পরে সেই সময় ও পরবর্তী পরিস্থিতির কারণ তার বই ‘১৫ আগস্ট:এ ন্যাশনাল ট্রাজেডি’তে প্রকাশ করেন। তিনি সামরিক পদক্ষেপ থেকে খুনীদের রক্ষার জন্যে তার ডেপুটিকে অভিযুক্ত করেন। অশীতিপর ওই জেনারেল ১৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহের কথা স্মরণ করে লেখেন, প্রথম দিন(১৯৭৫, ১৫ আগস্ট) থেকেই সে যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছিল এবং যে সহায়তা সে আমাকে দিতে চেয়েছিল তার সবই ছিল খুনীদের সহায়তা করার জন্য। শফিউল্লাহ বলেন, ১৫ আগস্টের সকালে তিনি জিয়া ও সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফকে তার বাড়িতে ডেকে পাঠান। উভয়ে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যেই চলে আসেন। কিন্তু জিয়া এসেছিলেন অফিসের গাড়িতে করে ইউনিফর্ম পরে, পুরোপুরি শেভ করা ছিলেন তিনি। তার গাড়িটি চালিয়ে নিয়ে এসেছিল অফিসের ড্রাইভার। অথচ খালেদ এসেছিলেন শেভ ছাড়াই পাজামা (রাতের পোশাক) পরে। তিনি নিজেই তার ব্যক্তিগত গাড়ি চালিয়ে আসেন। তিনি তার লেখায় আরো বলেন, ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে উভয়ে আমার সামনে হাজির হলেও সে সময়ে দুজনের এ পার্থক্য আমার মনে দাগ কাটেনি। কিন্তু আমি যখন ভাবার সময় পেলাম তখন বুঝতে পারলাম কে কি করছিল।
শফিউল্লাহ বলেন, তিনি হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে সৈন্য পাঠাতে ৪৬ ব্রিগেড কমান্ডার কর্নেল শাফাত জামিলকে সহায়তার জন্য খালেদকে ওই এলাকায় যাওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু ‘জেনারেল জিয়া এর বিরোধীতা করে বলেন, ‘তিনি (খালেদ) এটা নস্যাৎ করতে যাচ্ছেন।’ তিনি আরো লিখেন, ‘যখন আমি ওই সময়ের ঘটনাগুলো মনে করার চেষ্টা করি তখন এই প্রশ্নটি উদয় হয় যে- খালেদ কি নস্যাৎ করতে যাচ্ছে, যার কারণে জেনারেল জিয়া এতো উদ্বিগ্ন ছিল? ৪৬ব্রিগেড এলাকায় ওই পদক্ষেপটি কি তার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে হতে যাচ্ছিল?’ শফিউল্লাহ ওই সময়ের ঘটনা মনে করেন যে- খালেদ সেখানে যান এবং তিনি ফিরে আসলে “জেনারেল জিয়া পরামর্শ দেন যে- সিজিএস এর বাইরে বেরুনো উচিৎ না এবং সীমান্তে ভারতের আগ্রাসন মোকাবেলায় একটি অভিযানের নির্দেশের জন্য প্রস্তুতি নেয়া উচিৎ।” তিনি বলেন, ‘যদিও তখন এ ধরনের কোন ঘটনার কোন লক্ষণ ছিল না এবং তখন আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করা। আর এ জন্যই আমি জেনারেল জিয়াকে বলেছিলাম যে- আমাকে আগে এই পরিস্থিতি সামলাতে দাও।’ শফিউল্লাহ বলেন, তিনি এখন বিশ্বাস করেন যে জিয়া সম্ভবত ‘সেখানে যা ঘটছিল এবং সে যা করছিল তাতে কোন ধরনের হস্তক্ষেপ চায়নি।’
শফিউল্লাহ আরো লিখেন, রশিদ পরে তাকে জানায় যে- জিয়া তাকে আশ্বস্ত করেছিল যে, ‘যদি তারা তাদের অভিযানে সফল হয়, তবে সে ক্ষেত্রে সে তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিবে।’ খালেদের ওই পদক্ষেপটি তাদের পরিকল্পনাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারত উল্লেখ করে শফিউল্লাহ আরো লিখেন, ‘বিদ্রোহী (হত্যাকারী) সৈন্যরা এভাবে তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী অগ্রসর হয়েছে এবং তা জেনারেল জিয়ার আশির্বাদেই।’ তিনি বলেন, জিয়ার তথা-কথিত ভারতীয় আগ্রাসনের আশঙ্কাটি ‘অন্যদিকে মনযোগ আকর্ষণের চেষ্টা ছাড়া কিছুই ছিল না।’
শফিউল্লাহ্ বলেন, ‘আমাকে প্রধান বানানোর পর থেকেই’ মূলত জিয়া বঙ্গবন্ধু ও তার সরকারের বিরুদ্ধে তার হীন ষড়যন্ত্র করছিল এবং খন্দকার মোশতাক তা জানতেন। তিনি তার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন।
বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ের পর মোশতাক হত্যাকারীদের সরাসরি সহায়তা নিয়ে জিয়াকে সেনা প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম সেনা প্রধান আরো বলেন, ‘জেনারেল জিয়া যা চেয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তা অর্জন করে এবং এরপর তার চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে কর্মকা- শুরু করে।’


«