শরিফ ওসমান হাদি : নৈতিক বিদ্রোহের ঘোষণাপত্র – ড. দিপু সিদ্দিকী 

“গুলি থামাতে পারে দেহ, থামাতে পারে না সত্য”

শরিফ ওসমান হাদি : নৈতিক বিদ্রোহের ঘোষণাপত্র

এই লেখা কোনো শোকবার্তা নয়।

এটি কোনো স্মৃতিচারণও নয়।

এটি একটি ঘোষণা।

একটি সমাজ যখন দীর্ঘদিন অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে বেঁচে থাকতে শেখে, তখন অন্যায় আর অপরাধ থাকে না—তা হয়ে ওঠে নিয়ম। সেই নিয়ম ভাঙার সাহস যিনি করেন, তাকেই বলা হয় বিপজ্জনক। ওসমান শরীফ হাদী ছিলেন সেই বিপজ্জনক মানুষ—কারণ তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, কারণ তিনি মাথা নত করেননি।

শরিফ ওসমান হাদি কোনো ব্যক্তি নন।

তিনি একটি নৈতিক অবস্থান।

তিনি একটি প্রজন্মের বিবেক।

আমরা দল চাইনি, আমরা সত্য চেয়েছি

হাদি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি ছিলেন না। তিনি ছিলেন জনগণের পক্ষে দাঁড়ানো একক কণ্ঠ। দলীয় পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে নিরাপদ রাজনীতি তিনি করেননি। বরং তিনি উচ্চারণ করেছিলেন—

“আমি দল বেছে নিলে জনগণকে ছোট করা হবে।”

এই একটি বাক্যই বাংলাদেশের দলকেন্দ্রিক রাজনীতির মুখে চপেটাঘাত। কারণ যেখানে দলই শেষ কথা, সেখানে জনগণ কেবল সংখ্যা। হাদী সেই হিসাব উল্টে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন—জনগণই মালিক।

রাষ্ট্রের শত্রু ছিল না, নৈতিকতার বন্ধু ছিল

হাদি রাষ্ট্র ধ্বংস করতে চাননি। তিনি রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করতে চেয়েছিলেন। আর প্রশ্ন করাই ছিল তার অপরাধ। তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন—

 

“রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থনৈতিক নয়, নৈতিক।”

 

এই কথাটাই তাকে টার্গেটে পরিণত করেছে। কারণ অর্থনৈতিক সংকট লুকানো যায়, পরিসংখ্যান দিয়ে ঢেকে রাখা যায়। কিন্তু নৈতিক সংকট লুকায় না—তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়।

 

নির্লোভ জীবনই বিপ্লবীর প্রথম শর্ত

শরিফ ওসমান হাদির ছিল না বিলাসী ফ্ল্যাট, ছিল না পাহাড়সম ব্যাংক ব্যালান্স, ছিল না বিদেশি ডিগ্রির জৌলুশ। তিনি বনানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি পড়াতেন। ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ নামে যে সাংস্কৃতিক লড়াই তিনি চালিয়েছেন, সেখানে কর্মী ছিল হাতে গোনা।

এই স্বল্পতাই ছিল তার শক্তি।

“উচ্ছিষ্ট খেয়ে বিপ্লবী হওয়া যায় না।”

যার হারানোর কিছু নেই, তাকে কেনা যায় না। তাকে ভয় দেখানো যায় না। এই সত্যটাই ছিল ক্ষমতার জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর।

 

সংখ্যা নয়, প্রভাবই ইতিহাস লেখে

 

১৯৯৩ সালে জন্ম নেওয়া  শরিফ ওসমান হাদির বয়স ছিল মাত্র ৩২। কিন্তু প্রশ্ন হলো—জীবন কত বছর বাঁচা হলো, নাকি কী রেখে যাওয়া হলো?

কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে, উঁচু পদে বসে, কোনো প্রশ্ন না তুলে নিঃশব্দে মরে যাওয়া মানুষের অভাব নেই। কিন্তু ইতিহাস তাদের নামে থামে না। ইতিহাস থামে তাদের নামেই—যারা সময়কে অস্বস্তিতে ফেলে।

হাদি দেখিয়ে দিয়েছেন—

ইমপ্যাক্টলেস পঞ্চাশ বছর বাঁচার চেয়ে, ইমপ্যাক্টফুল কয়েক বছর বাঁচাই গৌরব।

মৃত্যু ছিল ভয় নয়, প্রস্তুতি

হাদী জানতেন কী আসছে। তবু থামেননি। ৩১ জুলাই ২০২৫ তারিখে তার উচ্চারণ ছিল কোনো আবেগ নয়, ছিল প্রস্তুত একজন মানুষের ঘোষণা—

“হারাম খাইয়া আমি এত মোটাতাজা হই নাই, যে স্পেশাল কফিন লাগবে।”

এটি শহীদ হওয়ার রোমান্টিকতা নয়। এটি ছিল হিসাব চুকিয়ে ফেলার আত্মবিশ্বাস।

এটি একটি খুন নয়, একটি ভীতু ব্যবস্থার স্বীকারোক্তি

হাদি হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়। এটি একটি বার্তা—যে ব্যবস্থা প্রশ্ন সহ্য করতে পারে না। হাদী নিজেই বলেছিলেন—

“যারা প্রশ্নকে ভয় পায়, তারাই গুলি চালায়।”

এই গুলি একজন মানুষকে থামাতে পারে।

কিন্তু প্রশ্নকে থামাতে পারে না।

চেতনাকে কবর দেওয়া যায় না।

আমরা কী শিখলাম

হাদি আমাদের শিখিয়ে গেছেন—

নিরাপদ থাকা মানেই সঠিক থাকা নয়।

নীরব থাকা মানেই বাঁচা নয়।

তিনি শিখিয়ে গেছেন—

অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় ইবাদত।

শেষ কথা নয়, শুরু কথা

ওসমান শরীফ হাদীর মৃত্যু কোনো শেষ নয়।

এটি একটি শুরু।

প্রতিটি তরুণের প্রশ্নে,

প্রতিটি অন্যায়ের মুখোমুখি দাঁড়ানো মুহূর্তে,

হাদী ফিরে আসবেন—নামে নয়, চেতনায়।

গুলি থামাতে পারে দেহ।

থামাতে পারে না সত্য।

Share: