বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট: গণতন্ত্রের ভাঙন, রক্তের মূল্য ও ভবিষ্যতের দায় – জা- দিয়া জাগরী

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক ভাঙন, নেতৃত্বের ব্যর্থতা এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির অনিবার্য পরিণতি। ওসমান হাদীর মৃত্যু ঘিরে যে অস্থিরতা ও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা আসলে এই গভীর সংকটেরই একটি দৃশ্যমান বহিঃপ্রকাশ। রাষ্ট্রের ভিত যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন একটি ঘটনাই যথেষ্ট—সমগ্র ব্যবস্থাকে টালমাটাল করে দেওয়ার জন্য।

 

এই সংকটের মূল শিকড়ে রয়েছে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিক ধ্বংস। সরকারি ব্যাংক, আদালত, নির্বাচন কমিশনসহ রাষ্ট্রের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা ধ্বংস করা হয়েছে। দীর্ঘ আওয়ামী শাসনে এই ক্ষয় চরম আকার ধারণ করেছে। আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতার দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ জমতে জমতেই একসময় বিস্ফোরিত হয়।

 

তবে ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এই পথের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছিল বিএনপি। আওয়ামী শাসনের প্রায় দুই যুগ আগে বিএনপি ভুয়া ভোটার সংযোজনসহ একটি কলঙ্কিত নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টা করেছিল। সে সময় তারা ব্যর্থ হলেও সেই ব্যর্থতা থেকেও আওয়ামী লীগের অদূরদর্শী নেতৃত্ব কোনো শিক্ষা নেয়নি। বরং একই ভুল আরও সুসংগঠিত ও দীর্ঘস্থায়ীভাবে পুনরাবৃত্তি করেছে। এর ফলেই রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়।

 

এই বাস্তবতায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে শুধুই একটি ক্ষমতার পালাবদলের আন্দোলন হিসেবে দেখলে বড় ভুল হবে। জুলাই বিপ্লব হয়েছিল সকল বৈষম্য দূর করার প্রত্যয়ে, অন্যায় ও দুঃশাসনের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে, এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পুনর্গঠনের আশায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়ন করা যায়নি। ফলে যারা শহীদ হয়েছেন, যারা রক্ত দিয়েছেন, তাদের সঙ্গে কার্যত এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতাই করা হয়েছে।

 

দেড় বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, অথচ দুর্নীতি বন্ধ হয়নি, অনিয়ম বন্ধ হয়নি, অর্থপাচার রোধ করা যায়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে তা আরও প্রকট হয়েছে। প্রশ্ন ওঠে—যদি পূর্বের দুর্নীতি দূর হওয়ার বদলে আরও গভীর হয়, যদি সাধারণ মানুষের ঘাড়ে শাসনের বোঝা আরও চেপে বসে, তাহলে এত শহীদ কেন? এত রক্তের মূল্য কোথায়? কবে আমরা শহীদদের প্রকৃত মর্যাদা দিতে পারব?

 

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের আরও পেছনে যেতে হয়—১৯৭১ সালে। মুক্তিযুদ্ধের শহীদরা রক্ত দিয়েছিলেন কেবল একটি পতাকা বা ভূখণ্ডের জন্য নয়; তারা রক্ত দিয়েছিলেন অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য, যেখানে সবাই মিলেমিশে কাঁধে কাঁধ রেখে এগিয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। কতিপয় দুর্নীতিবাজ, ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদ ও অদূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে জনগণের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা বারবার তিমিরেই রয়ে গেছে।

 

এর পরের ইতিহাসও রক্তাক্ত। স্বৈরাচার এরশাদের পতনের আন্দোলনে ডাক্তার মিলন, নূর হোসেন, রউফুন বসুনিয়া, বাদলসহ অসংখ্য ছাত্রনেতা ও সাধারণ মানুষ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতাতেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সহস্রাধিক তরুণ-তরুণী শহীদ হয়েছেন। আন্দোলনে শরিক হয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অগণিত মানুষ—একটি অভিন্ন স্বপ্ন নিয়ে।

 

সে স্বপ্ন ছিল সুশাসনের, বৈষম্যহীন সমাজের, শ্রেণিভেদ দূর করার, দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গড়ার, একটি কল্যাণমুখী বাংলাদেশের। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখলাম? দেশপ্রেমহীন, নৈতিকতাহীন এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন নেতৃত্ব দিয়ে জনগণের এই আকাঙ্ক্ষা কখনোই পূরণ করা সম্ভব নয়—এ সত্য আরও একবার নির্মমভাবে প্রমাণিত হলো।

 

এই প্রেক্ষাপটে দায় শুধু নেতৃত্বের নয়, জনগণেরও। জনগণকে আরও সচেতন হতে হবে নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে। কেবল দলীয় প্রতীক দেখে নয়—ব্যক্তির যোগ্যতা, দক্ষতা, সততা ও দায়িত্ববোধ যাচাই করার সক্ষমতা জনগণের মধ্যেই তৈরি করতে হবে। কারণ ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, জনগণের পাশে স্থায়ীভাবে কেউ এসে দাঁড়ায় না—জনগণকেই এগিয়ে আসতে হয়, জনগণকেই নেতৃত্ব তৈরি করতে হয়।

 

ওসমান হাদীর মৃত্যু, সম্ভাব্য অস্থিরতা, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র—সব মিলিয়ে সামনে দিনগুলো বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় যদি আমরা আবারও ভুল করি, যদি আবারও রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। শহীদদের রক্তের প্রকৃত সম্মান তখনই দেওয়া হবে, যখন আমরা একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র নির্মাণে সক্ষম হব। ইতিহাস আমাদের সেই দায়িত্বই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

Share: