
জাঁ-নেসার ওসমানের রম্যগদ্যধর্মী প্রবন্ধ “মুনীর চৌধুরীর কবর…” প্রথম দৃষ্টিতে হাস্যরসাত্মক সংলাপ মনে হলেও, গভীরে এটি একটি তীব্র রাজনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক দলিল। এই লেখাটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—রাষ্ট্র ও ক্ষমতার ইতিহাসে কখনো কখনো জীবিত মানুষের চেয়ে মৃত মানুষের কণ্ঠস্বরই বেশি প্রবল হয়ে ওঠে।
লেখাটি আবর্তিত হয়েছে শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর কালজয়ী নাটক ‘কবর’ এবং কথাশিল্পী শওকত ওসমানের বিখ্যাত উক্তি—
“লাশ কবরে শুয়ে থাকে না। লাশ কথা বলে।”
এই উক্তিকে কেন্দ্র করেই লেখক নির্মাণ করেছেন একটি দ্বন্দ্বমূলক সংলাপ, যেখানে অজ্ঞতা ও উপলব্ধি, ভয় ও প্রতিবাদ, জীবিত ও মৃত—এই বিপরীত সত্তাগুলো মুখোমুখি দাঁড়ায়।
রম্যর আড়ালে নির্মম বাস্তবতা
লেখাটির বড় শক্তি এর ভাষা। আঞ্চলিক উচ্চারণে রচিত সংলাপ পাঠককে হাসায়, কিন্তু সেই হাসির আড়ালেই উন্মোচিত হয় ভয়াবহ বাস্তবতা—স্বৈরশাসন, গুম, খুন, মতপ্রকাশের কণ্ঠরোধ এবং দীর্ঘদিনের জমে থাকা নীরবতা। লেখক দেখিয়েছেন, কীভাবে জীবিত মানুষ ভয়ে নিশ্চুপ থাকে, অথচ কোনো এক শহীদের মৃত্যু মুহূর্তে সেই নীরবতাই বিস্ফোরণে রূপ নেয়।

আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ফাইয়াজ, রায়হান—এই নামগুলো কেবল ব্যক্তিবিশেষ নয়; তারা প্রতীক। তারা প্রমাণ করে, ইতিহাসে বহুবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিবাদ এসেছে শহীদের রক্ত থেকে। এখানেই ‘কবর’ নাটকের রূপক বাস্তব জীবনে এসে দাঁড়ায়।
‘লাশের রাজনীতি’ ও আমাদের দায়
লেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আসে শেষদিকে—
এত লাশ, এত কবর দেওয়ার পরেও কি অন্যায়ের কবর হচ্ছে?
ঘুষ, দুর্নীতি, দমন-পীড়ন কি থেমেছে?
নাকি আমরা লাশের চিৎকারে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে এখন আর শুনতেই পাই না?
এই প্রশ্ন পাঠকের দিকে ছুড়ে দেওয়া হয়েছে সরাসরি। লেখক কোনো উপসংহার চাপিয়ে দেননি; বরং আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়িয়েছেন। “লাশের রাজনীতি” বন্ধ করার দায় কার—এই প্রশ্নে তিনি শাসকগোষ্ঠীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করান।

প্রবন্ধটিতে স্পষ্ট তো ফুটে ওঠেছে যে, ভয়ের কারণে জীবিত মানুষের নীরবতা স্বৈরাচারকে শক্তিশালী করে, আর শহীদের মৃত্যু সেই নীরবতা ভেঙে দেয়। কিন্তু বারবার লাশের ওপর ভর করে পরিবর্তন কোনো সভ্য সমাজের কাম্য হতে পারে না।
প্রশ্ন হলো—আমরা কবে জীবিত অবস্থায়ই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবো, কবে ‘লাশের রাজনীতি’ থেকে বেরিয়ে আসব?
মুনীর চৌধুরী ও শওকত ওসমানের সাহিত্যিক দর্শনকে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে জাঁ-নেসার ওসমান যে রম্যগদ্য নির্মাণ করেছেন, তা নিছক সাহিত্য নয়—এটি একটি সময়ের বিবেক-সংকটের দলিল। পাঠককে হাসাতে হাসাতে তিনি যে কঠিন সত্যটি সামনে আনেন, সেটিই এই লেখার সবচেয়ে বড় সাফল্য।
লেখক পরিচিতি: প্রফেসর ডক্টর দিপু সিদ্দিকী।ডিন, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ রয়েল ইউনিভার্সিটি অভ ঢাকা।
(লেখক: দিপু সিদ্দিকী)