ru

ইউক্রেনের সঙ্গে সৃষ্ট উত্তেজনার মধ্যে গত বছরের নভেম্বর মাসে দেশটির সীমান্তে সামরিক সমাবেশ করে রাশিয়া। লক্ষাধিক সেনা, বিশাল ট্যাংক ও আর্টিলারি বহরের পাশাপাশি যুদ্ধবিমান ও অ্যাটাক হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখা হয়।

রাশিয়ার এই সামরিক প্রস্তুতি দেখে মনে হচ্ছিল, একদিকে স্থল পথে দ্রুত অভিযান চালাবে রুশ স্থলবাহিনী। অন্যদিকে যুদ্ধবিমানের বিশাল বহর নিয়ে তড়িৎ বেগে ইউক্রেনের আকাশপথের নিয়ন্ত্রণ নেবে রুশ বিমান বাহিনী। সেই লক্ষ্যেই শুরু হয় সামরিক অভিযান।

কিন্তু ইউক্রেনের ১৩২টি যুদ্ধবিমান ও মাত্র ৫৫টি অ্যাটাক হেলিকপ্টারের বিপরীতে ১ হাজার ৩৯১টি যুদ্ধবিমান ও ৯৪৮টি অ্যাটাক হেলিকপ্টার নিয়েও ইউক্রেনের আকাশপথ নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি রাশিয়া।

সংখ্যা ও সক্ষমতার দিক থেকে রাশিয়ার বিমান বাহিনীর তুলনায় নগন্য হওয়ার পরও ইউক্রেনীয় বাহিনীর বিমানগুলো এখনও আকাশে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এমনকি তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও সক্রিয় রয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করছেন। রুশ বিমান বাহিনীর হলোটা কী, শোনা যাচ্ছে এমন প্রশ্নও। পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা এটাকে রাশিয়ার বড় ব্যর্থতা হিসাবে দেখছেন। তারা বলছেন, এই ব্যর্থতার পেছনে তিনটা কারণ রয়েছে-

এক. ইউক্রেন অভিযানে মস্কোর দুর্বল সামরিক প্রস্তুতি, দুই. ইউক্রেনের যথার্থ গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্র ও গোলাবারুদের ব্যবহার এবং তিন. রুশ বাহিনীর মোকাবিলায় ইউক্রেনকে পশ্চিমা মিত্র দেশগুলোর পর্য়াপ্ত সামরিক সহায়তা প্রদান।

এস্তোনিয়ার প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক একজন কমান্ডার জেনারেল রিহো তেরাস। তিনি বলছিলেন, ‘আমি যতদুর বুঝি, ইউক্রেন তাদের বিমান বিহরের বড় একটি অংশকে রুশ বাহিনী সেগুলো ধ্বংস করার আগেই ঘাঁটি থেকে সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য তাদের সহায়তা করেছে।’

জেনারেল রিহোর সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন যুক্তরাজ্যের বিমান বাহিনী রয়্যাল এয়ার ফোর্সের সাবেক কর্মকর্তা ও বর্তমানে ফ্রিম্যান এয়ার অ্যান্ড স্পেস ইনস্টিটিউটের গবেষণা সহযোগী সোফি অ্যান্টোবাসও। তিনি বলছেন, যুদ্ধের প্রথম দিকে ইউক্রেন ভাল কিছুপদক্ষেপ নিয়েছিল, যা এখন তাদের কাজে দিচ্ছে।

সোফি বলেন, ‘তারা (ইউক্রেন) বেশ চালাকি করেছে। তারা সব শক্তি একসঙ্গে মোতায়েন করেনি। এটা সম্ভবত রুশ বাহিনীর মধ্যে একটা অনিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি করেছে। এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক সহায়তা এসে পৌছানোর আগ পর্যন্ত নিজেদের আকাশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে ইউক্রেন।’

আকাশ পথ সুরক্ষায় ইউক্রেন এখন পর্যন্ত যেসব সরঞ্জাম ব্যবহার করেছে তার মধ্যে রয়েছে এস-৩০০ বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, স্টিংগার ও জ্যাভেলিন ক্ষেপণাস্ত্র। শক্তিশালী এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো ইউক্রেন যুদ্ধের গতিপথ নাটকীয়ভাবে বদলে দিয়েছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আকাশ পথ দখলের লড়াইয়ে আর কতদিন টিকবে ইউক্রেনীয় বাহিনী। এক কথায় এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এটা অনেকটা নির্ভর করছে রাশিয়ার ওপর। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ইচ্ছের ওপর।

গবেষক সোফি অ্যান্টোবাস যেমনটা বলছেন। তার মতে, পুতিন কতদিনে এই যুদ্ধ জিততে চান আর এই অভিযানে সিরিয়া যুদ্ধের কৌশল প্রয়োগ করবেন কি না তার ওপর নির্ভর করছে ইউক্রেন কতদিন এই লড়াইয়ে টিকে থাকবে।

২০১১ সালে শুরু হওয়া সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সহায়তায় লড়াইয়ে অংশ নেয় রুশ বাহিনী। ওই লড়াইয়ে ব্যাপক সহিংসতা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছেন পশ্চিমা নেতারা।

তবে সিরিয়ার মতো সহিংসতা চালাতে গেলেও এক্ষেত্রে রাশিয়া বড় ঝুকির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন অ্যান্টোবাস। সিএনএনকে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘পুতিন যদি সিরিয়ার মতোই চরমপন্থায় যেতে চান তাহলে সেটা রাশিয়ার জন্য বেশ ঝুঁকির হবে। এর কারণ ইউক্রেনের হাতে বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা রয়েছে। এবং পশ্চিম থেকে আরও অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে।

এক্ষেত্রে রাশিয়াকে অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে, এই লড়াইয়ে অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গে তারা কতটা সামরিক সরঞ্জাম ও সেনা হারাতে আগ্রহী। লন্ডনভিত্তিক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনসি্‌টটিউটের বিমান ও প্রযুক্তি বিষয়ক গবেষক জাসি্‌টন ব্রঙ্ক মনে করেন, বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ছাড়া রাশিয়া ইউক্রেনের আকাশ দখলে নিতে পারবে না।

আরও পড়ুন : পশ্চিমাদের শত শত বিমান জব্দ করলেন পুতিন

তাছাড়া এই মুহূর্তে রাশিয়ার তেমন সক্ষমতা নেই বলেও মনে করেন এই বিশ্লেষক। তার কথায়, ‘ইউক্রেনের বেশিরভাগ আকাশ দখলের ক্ষেত্রে জটিল ও বড় আকারের অভিযানের দরকার হবে। রুশ বিমান বাহিনী যে সেটা চালাতে পারবে তার পক্ষে খুব কমই তথ্য-প্রমাণ আছে।’

তবে কোনো কোনো বিশ্লেষক বলছেন, ইউক্রেন অভিযানে রাশিয়া তারবিশাল বিমান বাহিনীর একটি খণ্ডিত অংশ ব্যবহার করছে। সম্প্রতি নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ’তারা (রাশিয়া) আসলে প্রয়োজন ছাড়া তাদের বিমান এবং পাইলটদের নিয়ে অতিরিক্ত ঝুঁকি নিতে চাইছে না।’