pmp

শাদাব হাসিনঃআজ বাংলাদেশের মূকাভিনয় শিল্পের পথিকৃৎ পার্থ প্রতীম মজুমদারের জন্মদিন। চেরাগি আড্ডার পক্ষ থেকে জানাই আমাদের আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভ কামনা নিঃশব্দ নিয়ে পৃথিবীর জ্ঞানী ব্যক্তিগণ বিভিন্ন উক্তি দিয়ে গেছেন। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট মার্টিন লুথার কিং থেকে শুরু করে গণিতবিদ পিথাগোরাস- সকলেই নিঃশব্দের গুরুত্ব অনুধাবন করেছেন এবং জীবনযাপনে এই নিঃশব্দের বিভিন্ন ব্যাখ্যা-ব্যবচ্ছেদ করার চেষ্টা করেছেন। বিখ্যাত চীনা দার্শনিক লাও যু বলে গেছেন, সকল মহৎ শক্তির মুখ্য উৎস হচ্ছে নীরবতা। পিথাগোরাস বলেছিলেন, অর্থহীন কথা বা শব্দের চাইতে নীরবতা ঢের ভাল। নীরবতাও যে এত গুরুত্ব বহন করতে পারে আর অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে, তার আরেক দৃষ্টান্ত মাইম। মুখে কোনো শব্দ না করে শুধুমাত্র দেহের ভাষায় যে শিল্পগুণ রয়েছে, তা মূকাভিনয়ের মাধ্যমেই উৎসারিত হয়ে আসছে যুগের পর যুগ। মূকাভিনয় শব্দটিকে ভাঙলে পাওয়া যায় মূক আর অভিনয়। অর্থাৎ নির্বাক অভিনয়। আর এই নির্বাক অভিনয়ে আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত একজন মূকাভিনেতা বাংলাদেশের পার্থ প্রতিম মজুমদার। গত চার দশকে যিনি তাঁর মূকাভিনয়, তথা নিঃশব্দ অভিনয়ের প্রতিভাকে পুঁজি করে চষে বেড়িয়েছেন পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত। কঠোর শ্রম আর অধ্যবসায় তাঁকে নিয়ে গেছে খ্যাতি এবং কিংবদন্তী মাইম আর্টিস্টের তালিকায়। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি স্ত্রী ঝুমু মজুমদার এবং দুই ছেলে-মেয়ে দোয়েল এবং সুপ্রতিম মজুমদার সহ ফ্রান্সে বসবাস করেন। জগদ্বিখ্যাত এই মূকাভিনেতা নিঃশব্দে দৈহিক ভাষায় নাটক-সিনেমা-বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে দর্শককে আনন্দ দিয়ে থাকলেও, শৈশবে তাঁর দুরন্তপনার কোনো কমতি ছিল না। ১৯৫৪ সালের ১৮ জানুয়ারি পাবনার কালাচাঁদপাড়ায় তখনকার ফটোসাংবাদিক হিমাংশু কুমার বিশ্বাস এবং সুশ্রীকা বিশ্বাস দম্পতির ঘরে জন্ম নেন তিনি। নাম রাখা হয়েছিল প্রেমাংশু কুমার বিশ্বাস, আর ডাক নাম ছিল ভীম! মহাভারতের মহা পরাক্রমশালী চরিত্র ভীমের নামে রাখা হয়েছিল তাঁর ডাকনাম। ফটোসাংবাদিক এবং বনমালী থিয়েটারের সদস্য বাবার ক্যামেরা-স্টুডিও-থিয়েটার, ভজন গায়িকা মায়ের হারমোনিয়ামের সাথে তাঁর বেড়ে ওঠা। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে জন্ম নেয়ায় ছোটবেলা থেকেই তিনি সংস্কৃতিমনা হয়ে বেড়ে উঠেছিলেন। প্রথম স্কুলে যাওয়ার ঘটনাটাও মজার। তখনকার সময়ে স্কুলে ভর্তি হলে স্কুল থেকে গুঁড়ো দুধ বা পাউডার মিল্কের একটি কৌটো উপহার পাওয়া যেত। এই গুঁড়ো দুধের লোভেই বড় ভাইয়ের পেছন পেছন পাবনা জুবিলি স্কুলে তাঁর প্রথম ভর্তি হওয়া। বাড়িতে চৈত্র সংক্রান্তি অনুষ্ঠানে হাজরা উপস্থাপন করা হতো, সেখান থেকেই অঙ্গভঙ্গি আর ইশারায় ভাবের আদান-প্রদানের প্রভাব পড়ে তাঁর উপর। বাড়িতে ভিক্ষুক এলে ভিক্ষুকের মতো অঙ্গভঙ্গি করে ভিক্ষুকের পিছু নিতেন। আর রাতে মশারির স্ট্যান্ডে মায়ের শাড়ি বেঁধে মঞ্চ তৈরি করে চলতো থিয়েটারগিরি। হাজরায় বা বনমালী থিয়েটারে যেসব নাটক বা পারফর্মেন্স দেখাতো, সেগুলো বাসায় এসে অনুকরণ করে দেখাতেন, এবং তাঁর অনুকরণ করার ক্ষমতা ছিল প্রবল। পাবনার জুবিলি স্কুলে পড়াশোনা, থিয়েটার খেলা আর মাঠে ঘাটে দুরন্তপনার দিনগুলো হঠাতই বদলে গেল। বাবার ইচ্ছে ছিল ছেলেকে কলকাতায় পড়াশোনা করাবেন। পার্থ প্রতিম মজুমদারের কাকা সুধাংশু কুমার বিশ্বাস কলকাতায় থাকতেন। প্রাথমিক স্কুলের গন্ডি পার হবার পর তাই বাবার ইচ্ছেমতো কলকাতায় পড়াশোনা করে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হবার লক্ষ্যে তার সাথে চলে গেলেন কলকাতায়। কলকাতার পূর্ণ দাশ রোডের কাকার বাড়িতে উঠলেন তিনি। ড. শীতলপ্রসাদ ঘোষ উচ্চবিদ্যালয়ে ক্লাস সিক্সে ভর্তি করিয়ে দেয়া হলো তাঁকে। সেখানে থাকাকালীন একদিন পাশের বাড়ির এক লোককে তিনি দেখে বিস্মিত হয়ে গেলেন। লোকটা কোনো কথা না বলে অদ্ভুত নানান অঙ্গভঙ্গি করে হাঁটছেন, তা-ও আবার একই জায়গায়! হাঁটার ফলে তাঁর অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। আবার মুখ আঁকাবাঁকা করে কিম্ভুতকমাকার মুখভঙ্গি করছেন! এসব দেখে কিশোর পার্থ একদিন তাঁর কাকীকে জিজ্ঞাস করলেন, পাশের বাড়ির ঐ লোকটি পাগল কি না! এই কথা শুনে তাঁর কাকী হেসেই খুন! তারপর কাকীর মুখেই শুনলেন সেই অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করে হাঁটা মানুষটির নাম যোগেশ দত্ত, বিখ্যাত মাইম আর্টিস্ট। মনের ভাব প্রকাশে তাঁর কোনো কথা বলা লাগে না, অঙ্গভঙ্গিই যথেষ্ট। এটিই একধরনের শিল্প। এরপর থেকে তাঁকে মাইমের প্রতি ভাললাগা শুরু এবং যোগেশ দত্তের শিষ্যত্ব গ্রহণের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু যোগেশ দত্ত কিছুতেই তাঁকে মাইম শেখাতে রাজি হন না! তিনি তাঁকে বলেছিলেন ডাক্তার হতে। ডাক্তার হলে অনেক টাকা-পয়সা আয় করা যায়। কিন্তু তাঁর মনে মাইমের প্রতি যে ঝোঁক, তা রয়েই গেল। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নাছোড়বান্দা তিনি প্রতিদিন যোগেশ দত্তের সাথে দেখা করতেন। তাঁর একাগ্রতা দেখে শেষে একদিন জোগেশ দত্তই তাঁকে একস্থানে দাঁড়িয়ে হাঁটার কৌশল শিখিয়ে দেন। আর এভাবেই মূকাভিনয়ে পার্থ প্রতিম মজুমদারের হাতেখড়ি। কলকাতায় কাকার বাসায় থেকে পড়াশোনা আর যোগেশ দত্তের কাছে মাইম শিখে বেশ ভালোই কাটছিল সময়। এমন সময় শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে কলকাতায় তখন তারা শরণার্থী। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ফিরলেন নিজ মাতৃভূমিতে। ততদিনে যোগেশ দত্তের কাছ থেকে মূকাভিনয়ের পাঠ নিয়ে ফেলেছেন বেশ অনেকটাই। মিউজিক কলেজের প্রতিষ্ঠাতা বারীন মজুমদার ছিলেন পার্থ প্রতিম মজুমদারের বাবার বন্ধু এবং দুঃসম্পর্কের আত্মীয়। বারীন মজুদারের মেয়ে ‘৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে মারা গিয়েছিল বলে তিনি সুধাংশু কুমার বিশ্বাসের কাছে বলেছিলেন, প্রেমাংশুকে আমার কাছে দে, পেলে পুষে মানুষ করি। সেই থেকে প্রেমাংশু কুমার বিশ্বাস চলে গেলেন বারীন মজুমদারের কাছে। তাঁর নতুন নাম দেয়া হলো পার্থ প্রতিম মজুমদার। ভর্তি হলেন সেগুনবাগিচার মিউজিক কলেজে। নতুন নাম, গান আর মূকাভিনয়কে সঙ্গী করে শুরু হলো তাঁর নতুন জীবন। মিউজিক কলেজে গান শেখার পাশাপাশি প্রচুর সময় দিতেন মূকাভিনয় শেখার জন্য। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘন্টা অনুশীলন করতেন। ১৯৭৫ সালে মূকাভিনয়ের অনুষ্ঠান করার জন্য বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে ডাক পান।