sudan

Posted by: | Posted on: October 6, 2021

সুদানের অব্যবহৃত তেলের খনিগুলো চীনের জন্য নতুন কোনো আবিষ্কার নয়। ১৯৯৬ সালেই দেশটি সুদানের তেল শিল্পে প্রবেশ করেছে। এরপরবর্তী সময়ে সুদানের ওপরে যুক্তরাষ্ট্র কয়েকদফা নিষেধাজ্ঞা দেওয়া সত্ত্বেও চীন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে নিজেদের আগ্রহ অব্যাহত রেখেছে।

নিজেদের উচ্চাভিলাষী বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ সম্প্রসারণে বাণিজ্য রুটগুলোয় নিয়ন্ত্রণ নিতে চীনের জন্য আফ্রিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গৃহযুদ্ধে দক্ষিণ সুদানের যখন সঙ্গীন অবস্থা তখন দেশটিতে হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন করেছিল চীন। এটি ছিল দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘের শান্তি মিশনের আওতায় চীনের প্রথম সেনা নিয়োগ। স্পষ্টতই এটি ছিল বিদেশে দেশটির বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক সংযোগ রক্ষা করা।

এরমধ্যে যেসব প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ সুরক্ষা করা হয়েছে তারমধ্যে চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (সিএনপিসি) এবং গ্রেটার পায়োনিয়ার অপারেটিং কোম্পানি (জিপিওসি) উল্লেখযোগ্য। চীন অন্যদের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না এমন দাবি করলেও দক্ষিণ সুদানকে এক্ষেত্রে নীতির ব্যতিক্রম হিসেবেই ধরে নেওয়া হয়েছিল। দক্ষিণ সুদানকে তেলের আয় সংগ্রহ, অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা পূরণ, সস্তা শ্রম এবং সর্বোপরী যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের থেকে কোনো প্রতিযোগিতা না থাকার অন্যন্য সুযোগ হিসেবে দেখে থাকে। কিন্তু দক্ষিণ সুদান থেকে প্রয়োজনীয় তেলের মাত্র ২ শতাংশ সংগ্রহ করতে পারে চীন। তবে মুনাফা মার্জিন ৫০ শতাংশ হওয়ায় এখানে ঝুঁকি নিতেও চীন পিছপা হচ্ছে না। সম্প্রতি দক্ষিণ সুদানের তেলক্ষেত্রগুলো তেল উত্তোলনের পুরোপুরি উপযোগী হয়ে উঠেছে; দেশটি বর্ধিত তেল ধরে রাখার কৌশল ব্যবহার করে উৎপাদন হ্রাস ঠেকানোর চেষ্টা সত্ত্বেও তা খুব একটা সম্ভব হচ্ছে না।

সুদান ও দক্ষিণ সুদান উভয় ক্ষেত্রেই গ্যাস উৎপাদন না হওয়ায় সেখানে সম্পদের বিকল্প কোনো উৎসও নেই। অন্যদিকে এই দেশটি থেকে সংগৃহীত তেলের ৮০ থেকে ৯৫ শতাংশই রপ্তানি করে দেয় চীন। এ অবস্থায় চীনের কাছে দক্ষিণ সুদান পুরোপুরি অসহায় এবং ভুক্তভোগী। চীন এ অঞ্চলে তেলের পরিবর্তে অবকাঠামো উন্নয়নের নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে। দেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকে পাঠানো তেলের পরিমাণ তিনগুণ বাড়িয়েছে। এর আগে চীনের এক্সিম ব্যাংকে তারা দৈনিক ১০ হাজার ব্যারেল তেল পাঠিয়েছে; যা বর্তমানে বেড়ে হয়েছে ৩০ হাজার ব্যারেল। দক্ষিণ সুদানের রাজধানী জুবা থেকে রুমবেক পর্যন্ত ৩৯২ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে চীনের ব্যাংকটি দেশটিকে বিপুল অর্থ ঋণ দিয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিটির আওতায় দক্ষিণ সুদানের অবকাঠামো প্রকল্পটি সম্পন্ন হওয়ার মধ্যেই চীন তাদের অপরিশোধিত তেলের মজুদ বাড়াতে সক্ষম হবে।

আরও পড়ুন : পানযোগ্য একফোঁটা পানিও নেই বেলুচিস্তানের গন্ধাখায়

২০১১ সালে সুদান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর গোটা অঞ্চলটিকেই তেলের ৭৫ শতাংশ রাজস্ব লোকসানের ক্ষতিপূরণের জন্য খনিজ উত্তোলন বৃদ্ধি করতে হয়, বিশেষ করে দামি স্বর্ণের। চীন এ সুযোগটিও কাজে লাগায়। দামি এ খনিজটি উত্তোলনে প্রযুক্তিগত সহায়তা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিপুল বিনিয়োগের অফার করে। ক্রোমাইট খনিজ সন্ধানে ১৯৭০ সালে চীন সুদানে যায় এবং এ জন্য তারা বিপুল ভূতাত্ত্বিক জরিপ পরিচালনা করার সময় প্রচুর স্বর্ণ খনির খোঁজ পায়।

সুদানের খনি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে নিয়ে স্বর্ণসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের অনুসন্ধান করতে কাসালা এবং লোহিত সাগর রাজ্যের পাঁচটি ব্লকে ভূ-রাসায়নিক জরিপ পরিচালনার জন্য ২০১০ সালে চীন আবারো ভূতাত্ত্বিকদের কয়েকটি দলকে পাঠায়। এই জরিপের পর চীন এখানে তাদের কোম্পানিগুলোর জন্য বিপুল সম্ভাবনা দেখতে পায় এবং এখানে ২৩টি চীনা (মূলত ছোট ও মাঝারি ধরনের প্রতিষ্ঠান) কোম্পানিকে ৩০টি খনি থেকে স্বর্ণ, ক্রোমাইট, কালো বালু এবং মার্বেল উত্তোলনের জন্য পাঠায়। এ অঞ্চলে ব্যবসা সম্প্রসারণে কোম্পানিগুলো লাখ লাখ ডলার বিনিয়োগ করলেও অচিরেই তারা নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়।

যেসব খনিতে উত্তোলন কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকারের গঠিত আইনি অবকাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয় তারা নানা বিধিনিষেধ ও সম্ভাব্য লোকসানের সম্মুখীন হয়। অন্যদিকে নির্দিষ্ট কিছু খনিতে কাজ করার অনুমতি পাওয়া চীনা ব্যবসায়ীরাও বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে থাকে এবং একপর্যায়ে তারা এগুলোকেই পুঁজি করার সিদ্ধান্ত নেয়। লোকসান কমাতে চীনা ব্যবসায়িরা দক্ষিণ সুদানের স্বর্ণ বাজার কাপোয়েতার স্বর্ণ বাজারে বিনিয়োগের বিকল্প উপায় গ্রহণ করে। এই বাজারে বেশিরভাগ অবৈধ খনিজ পণ্য লেনদেন হয়।

আরও পড়ুন : চীনা ঋণের জালে দেড় শতাধিক দেশ

এছাড়াও সুদানের প্রেসিডেন্টের পরিবার অথবা রাজপরিবারের নিয়ন্ত্রিত খনিজ কোম্পানিগুলোয় শেয়ারহোল্ডার হিসেবে বিনিয়োগ করেছে চীন। আর এভাবেই তারা অত্যন্ত সাবলীলভাবে এইসব সীমাবদ্ধ খনিগুলোয় প্রবেশ করে। বিনিময়ে চীনা কোম্পানিগুলো বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের পাশাপাশি স্বর্ণ উত্তোলনের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতিও সরবরাহ করে। এর সুবাদে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা অথবা স্থানীয় বাধা ছাড়াই অব্যবহৃত মজুদগুলোয় খনি উত্তোলনের লাইসেন্স এবং জমি দখলের সুযোগ পায় চীনা বিনিয়োগকারীরা।

চীনের প্রাইভেট সিকিউরিটিজ সংস্থাগুলোর হুমকি

সুদান এবং দক্ষিণ সুদান উভয়েরই বিদেশি বেসরকারি সিকিউরিটি কোম্পানিগুলোর (পিএসসি) কার্যক্রম সীমিত করার জন্য কোনো পরিষ্কার আইন বা নীতিমালা নেই। এমনকি এ অঞ্চলের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইনেও পিএসসির বিষয়টি উল্লেখ নেই। ফলে লাইসেন্স থাকার পরেও প্রাইভেট সিকিউরিটি কনট্রাক্টররা প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র বহন এবং ব্যবহার করতে পারে না।

২০১৩ সাল পর্যন্ত চীনা তহবিলায়নে পরিচালিত শতাধিক কোম্পানি দক্ষিণ সুদানে নিবন্ধিত হয়। জ্বালানি থেকে শুরু করে প্রকৌশল, নির্মাণ, টেলিযোগাযোগ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, হোটেল, রেস্টুরেন্ট এবং রিটেইল রয়েছে এসব কোম্পানির তালিকায়। এছাড়া ২০২০ সাল শেষ হওয়ার আগেই বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পেও বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে চীন। জলবিদ্যুতের পাশাপাশি দক্ষিণ সুদানের বিদ্যুৎ বণ্টন এবং ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক স্থাপনের দিকেও নজর দিয়েছে চীন; যা এখন আলোচনাধীন রয়েছে। এর ফলে এখানে চীনের ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাড়বে এবং পিএসসিগুলোকে তাদের উদ্যেগ ও কর্মচারীদের দেখাশোনা করার সুযোগ করে দেবে।

দক্ষিণ সুদানে শক্তিশালী বিদেশি সংযোগের অনুপস্থিতির সুযোগে দক্ষিণ সুদান রীতিমতো চীনা প্রভাবের নিজেদের অর্থনৈতিক অবক্ষয় টেনে এনেছে। অথচ কঠোর যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার মাধ্যমে দেশটির এখন অনেক সুবিধার মধ্যে থাকার কথা ছিল।

অন্যদিকে দক্ষিণ সুদান আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংকের নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী জি ২০ ডেট সাসপেনশন ইনিশিয়েটিভে (ডিএসএসআই) অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। এর ফলে চীন থেকে নেওয়া ঋণে রীতিমতো নাস্তানাবুদ অবস্থা দেশটির। ২০১৭ সালে দেশটির ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২০ সালের শেষ নাগাদ শুধুমাত্র চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশনেরই সুদানের কাছে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার পাওনা রয়েছে। গত দশকে দক্ষিণ সুদানে গৃহযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে চীন এখানে অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির প্রকাশ ঘটিয়েছে।

সুদান এবং দক্ষিণ সুদানের মতো আফ্রিকার আরও অনেক দেশ চীনের ঋণ জালে ফেঁসেছে। যার পরিণতি হিসেবে এসব দেশ তাদের মূল সম্পদ এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রকৃতিক সম্পদ হারাতে বসেছে।

ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: পলিসি রিসার্চ গ্রুপ (পোরেগ)
লেখা: জেমস ক্রিকটন, লন্ডনভিত্তিক ব্যবসায় বিশ্লেষক, চীন এবং আফ্রিকা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ।