pm2

Posted by: | Posted on: September 28, 2021

যারা বঙ্গবন্ধুকে টেলিভিশনের পর্দায় দেখে তাঁর জলদ-ভাব-গম্ভীরভরাট কণ্ঠ শুনে আচমকা থমকে যান এবং নিবিষ্টমনে বলে ওঠেন, ‘ইশ, বঙ্গবন্ধু যদি বেঁচে থাকতেন’– তাঁদের জন্য এই লেখা। যাঁরা জাতির দুঃসময়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব দেখে আনন্দিত বোধ করার ক্ষমতা রাখেন এবং জাতির উদ্দেশ্য প্রদত্ত কোনও ভাষণে সুকান্ত-রবীন্দ্রনাথ-নজরুল থেকে তাঁর আবৃত্তি করাকে নেহায়েত দুর্ঘটনা মনে করেন না, তাদের জন্যে এই লেখা।

এই লেখায় আমি বাংলাদেশের আইনি সৌন্দর্যময় মন খুঁজবো। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর মহোত্তম পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানের স্বীকৃতি ও স্বরূপ সম্মুখে আনতে চাইবো। এভাবে শেখ হাসিনার সম্মানে এই নিবন্ধটা উপস্থাপন করে তাঁর জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাবার প্রয়াস পাবো। বলা জরুরি যে, এখানে আইনি ঐতিহ্যের শিল্পীত ডালায় সংবিধান, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইনের মিতালি– এই তিনটি বিষয় আমি বিশেষ করে বিবেচনায় নেব।

আমি জানি যে, যে কথা বলতে চাচ্ছি তার কিছু গ্রহণযোগ্য, দৃষ্টিগ্রাহ্য সমালোচনামূলক দিক থাকবে, কিন্তু বঙ্গবন্ধু-শেখ হাসিনা পরম্পরা বলতে গিয়ে খেয়ালিজন একটা ধারা ধরতে পারবেন। এবং হঠাৎ করেই ডাক্তারের নাড়ির স্পন্দন পরীক্ষা করার মতো মাঝে-মাঝে আমাদের আইনি-সংস্কৃতির প্রাণধারা হারিয়ে ফেলবেন।

আইনি সৌন্দর্যধারার শুরুর বহমান স্রোতকে এই দেশের ৫০ বছরের জীবনকালে কিছু নির্দিষ্ট সময়ে (সামরিক বা সামরিক মানসিকতাসম্পন্ন আমলে) থমকে যেতে দেখা যাবে। ভবিষ্যৎ দু’একটা ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়, কিন্তু সেটা আমি ধরছি না। দীঘির জলের দিকে হেলে থাকা বরই গাছের বড় ডাল কেটে ফেললে সে ডাল পুরো মানুষটাকে নিয়েই জলে পড়ে, ডালে দুই একটা পাকা বরই যে থাকে না, তাতো নয়!

ব্যাপারটা একটু খোলসা করি। বাংলাদেশ নামের এই মায়াময় দেশের জন্মের একটা আইনি দিক রয়েছে। পৃথিবীর যে রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছে তাদের মধ্যে বোধ করি বাংলাদেশ একমাত্র দেশ, যে দেশের মানুষ একদিকে যেমন দিগ্বিদিক দামামা বাজিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে রক্ত দিয়েছে, অন্যদিকে এই রাষ্ট্রের মহত্তম কারিগরেরা এর জন্মের আইনি বৈধতার ব্যাপারটি অতি সুনিপূণভাবে নিশ্চিত করেছেন। স্বাধীনতার অমোঘ ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে আমাদের পূর্বপুরুষেরা আন্তর্জাতিক আইনের নব-নব দিগন্তের ধারা অবমুক্ত করেছেন। বাঙালির জন্যে পৃথক একটি রাষ্ট্র বানানোর প্রক্রিয়া ছিল পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ কর্তৃক আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রয়োগের প্রথম উদহারণ। তেমনি করে এই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের বরাতেই আমরা এককভাবে স্বাধীনতা ঘোষণার বৈধতা, আন্তর্জাতিক রাষ্ট্র-স্বীকৃতির নীতি এবং ন্যায্য সরকার পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। মাত্র তিন মাসের মধ্যে ভারতীয় মিত্র-সৈন্যদের স্বদেশে ফেরত পাঠানোর মধ্য দিয়ে আমরা আন্তর্জাতিক আইনের ঈর্ষাকাতর বোধিনীও হয়েছি।

স্বাধীন দেশে হেমন্তের এক মিষ্টি বিকেলে মাত্র নয় মাসে আমরা গেঁথেছিলাম আমাদের রক্ত, ঘাম ও অশ্রুভেজা সংবিধান। আমরা যাতে করে ‘স্বাধীনসত্তায় সমৃদ্ধি লাভ’ করতে পারি, সেই জন্যে ‘মানবজাতির প্রগতিশীল আশা আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সঙ্গতি’ রেখে বৈশ্বিক সংবিধানিকতাবাদ-এর প্রতিচ্ছবি হয়ে আমরা তৎকালীন জমানার অন্যতম প্রাগ্রসর ওই ১৯৭২ সালের সংবিধান নিজেদেরকে দিয়েছিলাম। সেটা ছিল উদার অর্থে আমাদের রাষ্ট্রের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই জাতিকে দিয়ে যাওয়া শ্রেষ্ঠতম উপহার, যার ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে লেখা হয়: ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ… জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন’।

ইচ্ছে করলে তিনি সেদিন কোনও সংবিধান না দিয়েই, কোনও নির্বাচন না দিয়েই, পাকিস্তানের ভুট্টো-ইয়াহিয়া মডেলে এই রাষ্ট্রকে এককভাবে শাসন করতে পারতেন। আমাদের সংবিধানের ডালায় ও নকশায় রয়েছে শিল্পাচার্যের তুলির আঁচড়, নমস্য বাংলা অধ্যাপকের সৃষ্টিশীল মনন, সাহিত্যিক ও বাংলা ভাষার পণ্ডিতদের প্রজ্ঞার প্রয়োগ, রবীন্দ্রনাথের গানের কলি, মহত্তম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর হাতের পরশ ও স্বাক্ষর। শব্দের পিঠে শব্দ বিন্যাসিত হয়ে এক ভাষার শোভাযাত্রা তৈরি করেছে সংবিধানের বাংলা পাঠ। সন্নিবেশিত রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহ এবং মৌলিক অধিকারগুলো পড়লে এটা টের পাওয়া যায়। এতে যারা বাঙালিয়ানা খুঁজে পান না তাদেরকে করুণা করা ছাড়া আমরা আর কী করতে পারি?

১৯৭৩ সালে দেশীয় পর্যায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার করার জন্যে যে আইন জাতির জনক বানিয়েছিলেন, তা ছিল নুরেমবার্গ অথবা টোকিও ট্রায়াল নীতিমালাকে (১৯৪৬-৪৮) ছাপিয়ে বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশজ আইন। জাতির পিতা হিসেবে সুনির্দিষ্ট অপরাধী ছাড়া যে রাজাকারদের তিনি ক্ষমা করেছিলেন, তা বর্তমান যুগের লোকেরা ট্রানজিশনাল জাস্টিস অথবা রেস্টরেটিভ জাস্টিস নাম দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের বাজারে বিলিয়ে বেড়ায়।

১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের তরফে আমরা আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন দুটি আইন দেখতে পাই, শিশু আইন এবং সমুদ্র আইন। শিশু আইনের দর্শন আমরা পরবর্তীতে ১৯৮৯-এর জাতিসংঘ শিশু সনদে দেখি এবং সমুদ্র আইনের একক অর্থনৈতিক অঞ্চলের ধারণা (ইইজেড) ১৯৮২-এর জাতিসংঘ সমুদ্র কনভেনশনে পাই। ওই একই বছরে (১৯৭৪) আন্তর্জাতিক আইনের নীতিমালা প্রতিফলিত করে বাংলাদেশ প্রণয়ন করে বহিঃসমর্পন আইন।

এই হলো আমাদের আইনি ঐতিহ্যের এক চিলতে– লিগ্যাল হেরিটেজ। এর পরের গল্প এক বাক্যেও লেখা যায়, আবার লম্বা করেও বলা যায়। বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ ৮ম সংশোধনী মামলায় (১৯৮৯) এর পরের ইতিহাসকে বলেছেন সাংবিধানিকতাবাদের বালিয়াড়ি (Sand Dune), আর আরেকজন বিদগ্ধ বিচারপতি মুহম্মদ হাবিবুর রহমান ওই একই মামলার রায়ে একে আখ্যা দিয়েছেন সংবিধানের ‘সিকস্তি-পয়স্তি’ হিসাবে।

এরপর এই দেশে স্বদেশী বর্গীরা হানা দিলো। আমাদের স্বপ্ন লুট হয়ে গেলো। আমাদের কণ্ঠ বাজেয়াপ্ত হয়ে গেলো। হালাকু খানরা বাগদাদ যেভাবে দখল করে নিয়েছিলো, স্বঘোষিত জেনারেলরা আমাদের দেশ সেভাবে জয় করে নিলো। পশ্চিম পাকিস্তান হাইকোর্ট-এর প্রধান বিচারপতি জাস্টিস রুস্তাম কায়ানি একবার চট্টগ্রাম সফরে এসে এক বক্তব্যে আইয়ুব খানকে পরিহাস করে বলেছিলেন (১৯৬২): ‘সম্ভবত পাকিস্তান সেনাবাহিনী পৃথিবীর একমাত্র সেনাবাহিনী যারা নিজেদের দেশ নিজেরাই দখল করে নিয়েছে।’ একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো বাংলাদেশে আইয়ুব খান স্টাইলে দেশ চালানো মোশতাক-সায়েম-জিয়া-এরশাদ সময়ে (১৯৭৫-১৯৯০)।

সংবিধানকে মানুষের হাতে পৌঁছতে দেয়নি সামরিক সরকারগুলো। বিশেষ করে বাংলা সংবিধানের সলতে জীবন পুণ্য করে মানুষের হাতে জ্বলেনি তেমন। তখন আদালতের উঠান, বিচারক-আইনজীবী, ক্ষমতাসীনরা সংবিধানকে নিজেদের একচ্ছত্র সম্পত্তি হিসেবে ভেবেছেন। সংবিধানের ওপর সামরিক ফরমানকে প্রাধান্য দিয়ে তারা নার্সিসাস সিন্ড্রোমে ভুগেছেন। দেবী সার্সির মতো মাথায় টোকা দিয়ে মানুষকে বুঝিয়েছেন যে সামরিক আইনও আইন!

এমন রাজ্যে মানুষ সংবিধান নিয়ে কথা বলে ঠিকই কিন্তু সংবিধানে কী রাখা হয়েছে, কী জুড়ানো হয়েছে, কেন জুড়ানো হয়েছে তা কেউ তেমন জানার প্রয়োজন মনে করে না। ১৮২৫ এর রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ-এর ‘ডিসেম্বর জাগরণ’ এক চুটকি মনে পড়লো। জার আলেক্সন্ডার-এর বিদায়ের পরে তার সন্তান কনস্টান্টাইন এবং নিকোলাস এর মধ্যে ক্ষমতায় আসা নিয়ে ‘সিপাহী-জনতার বিপ্লব’ হয়। কনস্টান্টাইন-এর সমর্থকরা একটা সাংবিধানিক প্রবর্তনা চাচ্ছিলেন। তাই উচ্চ পর্যায় থেকে সিপাহী-জনতাকে ‘কনস্টান্টাইন’ ও ‘কনস্টিটিউশন’ (রাশিয়ান ভাষায় কনস্টিটুটস্যুয়ে)- এর নাম করে স্লোগান দিতে বলা হয়েছিল। তাদের যখন জিজ্ঞেস করা হলো তারা কিসের স্লোগান দিচ্ছেন, জবাবে সিপাহী-জনতা জানালো তারা কনস্টান্টাইন ও তার স্ত্রী ‘কনস্টিটুটস্যুয়ে’ -এর মঙ্গল কামনা করে স্লোগান দিচ্ছেন!

আমাদের মানুষজনকে অনেকটা ওই ধরনের সাংবিধানিক ‘ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি’র মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। সামরিক শাসককে ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা’ হিসাবে ভাবতে শেখানো হয়েছে!

১৯৭৫-১৯৯০ আমাদের জাতীয় আইনি মানসে এক অন্ধকারাচ্ছন্ন অধ্যায়। আইনের ছাত্ররা চোখের পলকে, মনের নিমিষে এই সময়ের মধ্যে মানবাধিকার, গণতন্ত্র, কিংবা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি আমাদের দেশের প্রতিশ্রুতির ইঙ্গিতবাহী তেমন বড় কোনও আইন বা বিখ্যাত কোনও মামলার সিদ্ধান্ত পাবেন না। এমনকি দুই একটা ব্যতিক্রম ছাড়া ১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৮ সময়কালকেও আপনি এই অন্ধকারের মধ্যে আনতে পারেন। বিশ্বাস না করলে বই না দেখে চোখ বুঁজে ভাবনার সাহসটা করুন, তেমন বলার মতো মানবাধিকার সমভাবাপন্ন ওই সময়ের কোনও আইন আপনি পাবেন না, যেটা আমাদের আইনি সংস্কৃতির পূর্বধারায় মূল্যবান সংযোজন হিসেবে কাজ করেছে বা করতে পারতো, বরং উল্টোটা পাবেন।

আসুন, আমরা ওই আইনি ক্রমধারাটির নাম দেই বিচারহীনতার সংস্কৃতি বা দায়মুক্তির ধারা (Culture of Impunity)।

জাতির স্থপতিকে সপরিবারে হত্যা করে তাঁর দিয়ে যাওয়া পবিত্র সংবিধানে খুনি জিয়া-মুশতাক ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ জারি করে তাঁর বিচারের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছিলো। শেখ হাসিনাকে পুরো জাতির সমান্তরালে দাঁড় করিয়ে এই হুজ্জতি-প্রলয় ২১ বছর ধরে সংবিধানে ছিল। কারও কিছু মনে হয়নি! ১৯৯১ সালে দেশ যে সংসদীয় ধারায় ফিরেছিল, সেই প্রস্তাবও এনেছিলেন শেখ হাসিনার পক্ষে তৎকালীন বিরোধী দলীয় সংসদ উপনেতা আব্দুস সামাদ আজাদ। বিএনপি অবস্থার প্রেক্ষিতে সংসদীয় ধারার সরকার প্রবর্তন করেছিলো, কিন্তু ইনডেমনিটি আইন বাতিলের প্রয়োজন মনে করেনি।

বরং দায়মুক্তির সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় আমরা পাই ১৯৯১ সালে আব্দুর রহমান বিশ্বাসকে রাষ্ট্রপতি করার জন্য প্রকাশ্য ব্যালট সিস্টেম চালু করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন সংশোধন, ১৯৯৪ সালে গোলাম আযমের নাগরিকত্ব প্রদান, ২০০৩ সালের অপারেশন ক্লিন হার্টের মাধ্যমে বিনা বিচারে মানুষ হত্যা করে বিচার না করার আইন, ২০০৪ সালে চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতিদের অবসরের বয়স ৬৭ বছর করে নিজেদের রাজনৈতিক ভাবধারার বিচারপতি কেএম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করে সুষ্ঠু নির্বাচনের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার ব্যবস্থা। নিয়তির কী পরিহাস, বিএনপি কাঙ্ক্ষিত ও আহুত দুটো দায়মুক্তি আইনই (ইনডেমনিটি ১৯৭৫ ও ক্লিনহার্ট ২০০৪) পরবর্তীতে উচ্চ আদালতে বাতিল হয়ে গেছে [শাহরিয়ার রশিদ খান ১৯৯৬, জেড.আই. খান পান্না ২০১৭]।

১৯৯৬-এর ১২ জুনের ঐতিহাসিক নির্বাচনে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় এসে পিতৃ হত্যার বিচার করার জন্যে আগে ইনডেমনিটি আইন বাতিল করতে হয়, বিএনপি-জামায়াত সেদিন সংসদে অনুপস্থিত থাকে এবং হরতাল ডাকে। খুনি শাহরিয়ার রশিদ ইনডেমনিটি আইন বাতিলকে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করে হেরে যায়। এবং শেখ হাসিনাকে এগুলো চেয়ে চেয়ে দেখতে হয়। ইচ্ছে করলে তো তিনি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে জেনারেল জিয়ার কায়দায় খুনিদেরকে অবলীলায় ফাঁসি দিতে পারতেন। আমরা জানি, জেনারেল জিয়াউর রহমান তাঁর আমলে এগারোশোর বেশি মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচারের নামে হত্যা করে।

অথচ প্রচলিত সাধারণ ফৌজদারি আদালতে জাতির পিতা হত্যার বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যে দৃষ্টান্ত শেখ হাসিনা রেখেছেন, শুধু এই কারণেই বাংলাদেশের মানুষের কাছে শেখ হাসিনা নিরন্তর নমস্য হয়ে থাকবেন। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমেদকে দিয়ে উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগ না করার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১০ বছরের জন্যে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় কার্যকর স্থগিত করে দেয়। এবং নয় বছর পর ২০০৯ সালে আবার ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনাকে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের কয়েকজনের ফাঁসি নিশ্চিত করতে হয়। তখন আমরা তাঁকে ‘প্রতিশোধপরায়ণ’ হিসেবে আখ্যা দেই! এবং আমরা তাঁকে আইনের শাসনের সবক দিতে থাকি! হায় সেলুকাস! কী বিচিত্র এই দেশ!

১৯৯৬ এর গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তিতে ভারত থেকে পানি আসা শুরু হয়। ১৯৯৭-এর ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির মাধ্যমে জেনারেল জিয়ার সামরিকায়ন নীতির ফলে টালমাটাল হয়ে ওঠা পাহাড়ি-বাঙালি দ্বন্দ্বের হাত ধরে পাহাড়ি অঞ্চলে ৩০ হাজার মানুষের রক্তপাতের ধারা বন্ধ হয়ে যায়। বিএনপি এই শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদে হরতাল করে, লংমার্চ করে, কিন্তু আর কিছু করে না। এরা অনেকটা মাথা গুঁজে স্ত্রীর ‘আয় খাওয়া’ অপারগ গৃহকর্তার মতো, যারা ‘স্ত্রী বাইরে কেন গেছে’ এই অভিযোগে রাগে গজ গজ করে। কিন্তু আর কিছু করে না। এরা তথ্য-প্রযুক্তি বিপ্লবকে ধারণ করে না, কিন্তু শেখ হাসিনার নিন্দায় একে ব্যবহার করে। কী এক আত্মপ্রবঞ্চনা!

১৯৯৬-এর শেখ হাসিনা সরকার আইন কমিশন আইন করে আইন সংস্কারে এর অঙ্গীকার আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে নিয়ে আসে। ১৯৯৭ এর স্থানীয় সরকার আইন, খাস জমি বন্দোবস্ত নীতিমালা, ২০০০ সালের আইনগত সহায়তা আইন, একই বছরের নারী নির্যাতন দমন আইন, ২০০১ এর অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পণ আইন ওই সময়কার শেখ হাসিনা সরকারের ঝুলিতে নতুন অর্জন হিসেবে যুক্ত হয়। এই সময়ে ১৯৬৬-এর দুই যমজ মানবাধিকার দলিল– আইসিসিপিআর এবং আইসিইএসসিআর-এ অনুস্বাক্ষর করে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি আমাদের সংবিধানের যে প্রতিশ্রুতি তা শেখ হাসিনা সুউচ্চে তুলে ধরেন। এই সময়ে বাংলাদেশ সমুদ্র বিষয়ক জাতিসংঘের তৃতীয় কনভেনশন (১৯৮২) অনুসমর্থন (Ratification) করে রাখে, যেটা ২০০৯ এসে বাংলাদেশকে ভারত ও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সমুদ্র-বিরোধ নিষ্পত্তিতে আইনি-বাধার দরজা উন্মুক্ত করে দিতে সাহায্য করে।

বাংলাদেশের ৫০ বছরের আইনি ইতিহাসকে যদি দুটো পর্বে ভাগ করি তাহলে বোধ হয় আমরা এভাবে বলতে পারবো– একটা ২০০৯ পূর্ব সময় আর একটা ২০০৯ পরবর্তী সময়। কেননা, এই ২০০৯ সালেই মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন উদ্দীপক কিছু আইন বাংলাদেশ প্রণয়ন করেছে। দেখা যায়, গত দশকে প্রণীত আইনগুলোর প্রস্তাবনায় সংবিধান, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের দোহাই দেওয়া হয়, যেটা আগে থাকতো না। এই ধারা নতুন স্বদেশী আইনবিজ্ঞান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি করেছে বলে মনে হয়। এর জন্য অবশ্য আইনি ‘বাতি জালানি’ (Legal Enlightenment) ঘটা দরকার।

২০০৯-এর ত্রয়ী আইন – জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, তথ্য অধিকার আইন, ভোক্তা অধিকার আইন এই সারিতে অগ্রগামী। সামরিক আদেশের রাহুমুক্ত করে সংবিধানে ২০১১ সালে ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে ফিরে আসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ এবং এর চারটি স্থায়ী বুনিয়াদ– বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। সেক্যুলারিজম-এর বাংলা হিসেবে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ যথেষ্ট উত্তাপ ছড়িয়েছে আমাদের জাতীয় জীবনে। বিচারপতি গোলাম রাব্বানী সেক্যুলারিজম এর বাংলা ‘লোকায়ত’ লেখেন (বাংলাদেশ সংবিধানের সহজ পাঠ, সমুন্নয়, ২০০৮)। কিছু দৃষ্টিভঙ্গিতে দাবি করা হয় (যেমন, আবুল মনসুর আহমদ, প্রথমা, ২০১৭) যে, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদির মতো তাত্ত্বিক বা দার্শনিক ধারণা সংবিধানে থাকা উচিত নয়। এতে বিতর্ক কমে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি দুটো কারণে গ্রহণযোগ্য নয়– এক. উল্লিখিত ধারণাগুলো ধারণামাত্র নয়, সেগুলো যেমন লক্ষ্য তেমনি অর্জনের উপায়ও;

দুই. সেগুলোর মুগ্ধকর সংজ্ঞা ১৯৭২ সালের সংবিধানে দেওয়া ছিল, যা জেনারেল জিয়া সামরিক কাঁচির খোঁচায় পরবর্তীতে বাদ দিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করেন।

১৫তম সংশোধনীর হাত দিয়ে বেশ কিছু ব্যাপারের সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অথচ কম প্রশংসিত বিষয় সংবিধানে ঠাঁই পায়। এর একটি হলো ‘ক্ষুদ্র-নৃতাত্ত্বিক’ জনগোষ্ঠীর অধিকারের সন্নিবেশের মাধ্যমে আদিবাসী সংস্কৃতির লালন (অনুচ্ছেদ ২৩-এ) এবং প্রজন্মান্তরের অধিকার সন্নিবেশের মাধ্যমে জীব-বৈচিত্র্যের সংরক্ষণের বিধান (অনুচ্ছেদ ১৮-এ)।

পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতন নিবারণ আইন (২০১২), অভিবাসন আইন (২০১২), ২০১৩ সালের শিশু আইন ও ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য আইন, উদ্ভিদের জাত সংরক্ষণ আইন ২০১৯ ইত্যাদি আইন প্রণয়ন দেশীয় অবস্থানে থেকে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের কাছাকাছি যাবার প্রয়াস বলে ভাবা যেতে পারে।

স্বীকার্য যে, ২০১৮ এর সড়ক পরবিহন আইন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বেশ কিছু ধারার যৌক্তিক সমালোচনা রয়েছে, রয়েছে ১৬তম সংশোধনীর অস্বস্তি, যা আওয়ামী লীগের আইনি প্রণয়ন ঐতিহ্যের সাথে অসাযুজ্যপূর্ণ।

১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের আলোচনা আমি এই লেখায় ইচ্ছে করেই তুলিনি, কেন না প্রতিটি ক্ষমতাসীন সরকার এর সুবিধা নিয়েছে, এবং এর ধারাবাহিক অপপ্রয়োগ আমাদের আইনি ঐতিহ্যে স্থায়ী অভিঘাত সৃষ্টি করেছে।

এবার আমি লেখাটা গুটিয়ে আনার সাহসটা করি। ১৯৭৩-এ জাতির জনক যুদ্ধাপরাধের বিচারের আইন করে যান, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বড় পরিসরে সেটা করেছে ১৯৯৮ সালে, রোম সংবিধিতায়। শেখ হাসিনা রোম সংবিধি স্বাক্ষর করেন ১৯৯৯ সালে, আর অনুসমর্থন করেন ২০১০ সালে।

এই কাজগুলো না করলে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধকালীন সংঘটিত অপরাধের বিচার আর করা হয়ে উঠতো না। এমনকি রামপাল প্রকল্পে যাদের আপত্তি, তারা যে পরিবেশ বিপর্যয়ের দায়ে শেখ হাসিনাকে জেনেভা নিতে চেয়েছিলেন, সেই আদিখ্যেতাও তারা দেখাতে পারতেন না। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনবিজ্ঞানে আজ বাংলাদেশ অন্যতম একটা অধীত নাম।

বঙ্গবন্ধু শিশু আইন করেন ১৯৭৪ সালে, শেখ হাসিনাকে ২০১৩ সালে এসে সেটাকে যুগোপযোগী করতে হয়। বঙ্গবন্ধু সমুদ্র আইন করেন ১৯৭৪ সালে, শেখ হাসিনাকে এখন সেটা যুগোপযোগী করতে হচ্ছে ব্লু ইকোনমির হাতছানি দেওয়া অবারিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগনোর জন্যে।

জাতিসংঘ সমুদ্র কনভেনশন (১৯৮২) অনুসমর্থনের পরে দেশের দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা সমুদ্রভাগ্য নির্ধারণে বাজি ধরতে হয়। বাংলাদেশের আর কোনও রাজনৈতিক নেতা এই সিদ্ধান্ত নিতেন বলে আমার বিশ্বাস হয় না। জনগণের স্বার্থ জড়িত, অথচ শেখ হাসিনা চুপ থাকবেন এমনটি হওয়ার নয়। শেখ হাসিনা এমন এক রাজনীতিক, হতাশা যাকে মানায় না। ভারত-মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক সালিশী এবং সমুদ্র ট্রাইব্যুনালে নিয়ে (২০১২, ২০১৪) সমুদ্র বিরোধ নিষ্পন্ন করে শেখ হাসিনা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা এখন অন্য দেশের নেতারা অবাক বিস্ময়ে অনুসরণ করছেন, আর পৃথিবীর সমুদ্র আইনের মুয়াল্লেম আর তালেবে-এলেমগণ বসে বসে গবেষণা করছেন।

এই সুন্দরতম বিষয়গুলো এমনই এমনই ঘটতে পারে না, ঘটে না। এর পেছনে কিছু মানুষের সুন্দর মন থাকতে হয়, মেধা-মনন, ভাবনা, আকাঙ্ক্ষা-খেয়াল থাকতে হয়। এই ‘খেয়াল’ থাকাটাই শেখ হাসিনার রাজনীতিকে অন্য রাজনীতিকের রাজনীতি থেকে স্বতন্ত্র ও মহিমা উদ্ভাসিত করেছে। অনেক সময় তিনি শ্রুতিপ্রিয় বক্তা নন, কিন্তু ঝানু বিতার্কিক, দক্ষ পার্লিয়ামেন্টারিয়ান। সেটা সংসদে তাঁর সবাক, সাবলীল, স্থিতিপ্রজ্ঞ, অর্থবহ ও সহাস্য-সক্রিয় উপস্থিতি খেয়াল করলে ধরতে পারা যায়।

সংগ্রামে দুর্জয় বাংলার মানুষ হাসিনাপ্রসূত রাজনীতির মূল উপজীব্য। এই মানুষগুলোর প্রতি তাঁর দায়বোধ ও জেদ তাঁর রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও আইনি দর্শনকে স্থায়ী করেছে। এই দায়ভারই তাঁর নিয়তি। এই দায়ভার তাঁর উত্তরাধিকার।

তাঁর জেদ তিনি বাংলাদেশকে হারিয়ে যেতে দেবেন না। তাঁর জেদ তিনি বাংলাদেশকে ভালো রাখবেন। এদিক দিয়ে তিনি তাঁর বাবার সমান। যতবার (কমপক্ষে ২১ বার) তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে, ততবার তিনি মাথা উঁচু করে দু’হাতে মৃত্যুকে ঠেলে অনন্ত আকাশের দিকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছেন। আকাশ তাঁর শিরস্ত্রাণ, মানুষ তাঁর কর্ম।

আমরা আশ্রয় পাই। আমরা ডিজিটাল হয়ে উঠি। আমাদের অর্থনীতির রুপান্তর ঘটে। আমরা ২০৪১ সালকে দেখতে পাই টুকরো টুকরো। আমাদের আলোকায়ন ঘটে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার ৭৫তম জন্মদিনে তাই ‘অপমান তব করিব না আজ করিয়া নান্দী পাঠ।’ শুধু বলবো– ‘জয়তু, শেখ হাসিনা!’ আপনি বহু বহু গৌরাবান্বিত অর্জনের মধ্যে আমাদের সমৃদ্ধতর আইনি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। জয় বাংলা।

লেখক: শিক্ষক, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

ইমেইল: billah002@gmail.com