cip

Posted by: | Posted on: September 1, 2021

প্রেস ওয়াচ রিপোর্টঃ

বিদেশে যারা কর্মী পাঠিয়ে দেশের অভিবাসন খাতে অবদান রাখছেন তাদেরকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় রিক্রুটিং এজেন্টদের ‘বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’-সিআইপি হিসেবে সম্মানিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। এজন্য ‘বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (বৈদেশিক কর্মসংস্থান) নির্বাচন নীতিমালা-২০২১’ চূড়ান্ত করে  গেজেট প্রকাশ করেছে।

রিক্রুটিং এজেন্টদের পাশপাশি অনিবাসী বাংলাদেশিদের (এনআরবি) জন্য আগে থেকেই সিআইপি নির্বাচন ব্যবস্থা চালু আছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, এতে রিক্রুটিং এজেন্টরা আরও  বেশি উৎসাহিত হবেন। 

নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতি বছর ২০ জন রিক্রুটিং এজেন্টকে সিআইপি’র জন্য নির্বাচন করা হবে। এর মধ্যে তিন জন সিআইপি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে এবং জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ-বায়রা’র নির্বাচিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদাধিকার বলে সিআইপি নির্বাচিত হবেন।

নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অর্জিত হয় এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে রিক্রুটিং এজেন্টরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যেহেতু, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী (রিক্রুটিং এজেন্ট শ্রেণী বিভাগ) বিধিমালা, ২০২০ এর বিধি ৮ এর উপবিধি (২) অনুযায়ী, রিক্রুটিং এজেন্টদের নিরাপদ, নিয়মিত, মানসম্পন্ন ও দায়িত্বশীল অভিবাসন কার্যক্রমের জন্য সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্টকে স্বীকৃতি ও প্রণোদনা প্রদানের বিধান আছে এবং  যেহেতু, দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সরকার প্রতি বছর রিক্রুটিং এজেন্টদের মধ্য থেকে বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (বৈদেশিক কর্মসংস্থান) নির্বাচনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, সেহেতু এই উদ্দেশ্য পূরণ করার লক্ষ্যে সরকার নীতিমালা প্রণয়ন করলো।

নীতিমালা অনুযায়ী, সিআইপি নির্বাচনের ক্ষেত্রে আবেদন করার বছর থেকে আগের দুই বছরের কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হবে।  

যারা আবেদন করতে পারবেন

সিআইপি হতে কিছু শর্ত পূরণ করা লাগবে রিক্রুটিং এজেন্টদের। নীতিমালা অনুযায়ী, স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী এবং প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রে ওই কোম্পানির পরিচালনা পরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত চেয়ারম্যান বা ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিআইপি (বৈদেশিক কর্মসংস্থান) হওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন।

আবেদনকারী রিক্রুটিং এজেন্টকে সংশ্লিষ্ট মেয়াদে নারী ও পুরুষ মিলিয়ে ন্যূনতম দুই হাজার কর্মীর বিদেশে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। ন্যূনতম ১০০ জন কর্মীকে ডিমান্ড লেটারের মাধ্যমে বিদেশ পাঠাতে হবে।  ন্যূনতম ৩০০ জন বিদেশ গমনেচ্ছু কর্মীকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আবেদনকারী আদালতে সাজাপ্রাপ্ত নন এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান সংক্রান্ত কোনও অভিযোগে অভিযুক্ত নন— এই মর্মে হলফনামা জমা দিতে হবে।

যারা আবেদন করতে পারবেন না

আবেদনকারী রিক্রুটিং এজেন্টের লাইসেন্স হালনাগাদ নবায়ন করা না থাকলে, অথবা তার লাইসেন্স স্থগিত করা হলে, সিআইপি’র জন্য আবেদন করতে পারবেন না। এছাড়া বিদেশে নিয়োগকর্তার সঙ্গে আবেদনকারী রিক্রুটিং এজেন্টের বাণিজ্য বিরোধ থাকলে এবং আবেদনকারী ওই বিরোধ সমাধানে আগ্রহী না হলে, বা দীর্ঘসূত্রতার পথ অবলম্বন করলেও আবেদন করতে পারবেন না। আবেদনকারী আদালত কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত হলে এবং সাজা ভোগ করার পর পাঁচ বছর সময় অতিবাহিত না হলে, কিংবা অন্য কোনও কারণে অবাঞ্ছিত ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হলে এবং  আবেদনকারী ঋণখেলাপি হলে আবেদনের জন্য অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।

পাশপাশি আবেদনকারীর বাংলাদেশে টিআইএন কিংবা ই-টিআইএন না থাকলে এবং  আবেদনকারী করখেলাপি হলে আবেদন করতে পারবেন না।

এছাড়া আবেদনকারী যদি ভুল তথ্য দেন এবং যদি তা ভুল প্রমাণিত হয়, তাহলে  কোনও ব্যক্তি সিআইপি (বৈদেশিক কর্মসংস্থান) হিসেবে নির্বাচিত হয়ে থাকলেও তা বাতিল বলে গণ্য করা হবে। তাছাড়া তিনি ভবিষ্যতে সিআইপি (বৈদেশিক কর্মসংস্থান) হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন না।

যেসব সুবিধা পাবেন নির্বাচিত সিআইপিরা

আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে যারা সিআইপি নির্বাচিত হবেন, তাদের তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশ করবে মন্ত্রণালয়। নির্বাচিত সিআইপিরা  প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে সরকার অনুমোদিত পরিচয়পত্র পাবেন,  পরিচয়পত্রের মেয়াদকালীন সময়ে সচিবালয়ে প্রবেশের জন্য প্রবেশপত্র পাবেন,  মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিষয়ক নীতি নির্ধারণী কমিটিতে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।

এছাড়া রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান যেমন- বিজয় দিবস, স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মবার্ষিকী, মে দিবস, জাতীয় শোক দিবস, আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবসসহ গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে জাতীয় অনুষ্ঠান, সিটি করপোরেশন আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা এবং বিদেশে অবস্থান করলে দূতাবাস  আয়োজিত এরূপ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পাবেন।

নির্বাচিত সিআইপি’রা  বিমান, রেল, সড়ক ও জলযানে আসন সংরক্ষণে অগ্রাধিকার পাবেন এবং তার স্ত্রী, পুত্র, কন্যা ও নিজের চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতালে কেবিন সুবিধাপ্রাপ্তিতে অগ্রাধিকার পাবেন। বিমানবন্দরে ভিআইপি লাউঞ্জ-২ ব্যবহার এবং স্পেশাল হ্যান্ডলিংয়ের সুবিধা পাবেন সিআইপিরা।

তবে সরকার সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে কোনও কারণ প্রদর্শন ব্যতীত, কোনও নির্বাচিত সিআইপি (বৈদেশিক কর্মসংস্থান) কে প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধা প্রত্যাহার করতে পারবে।

নীতিমালা অনুযায়ী, সিআইপি নির্বাচনের প্রাথমিক বাছাই কমিটি করা হবে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব অথবা যুগ্ম সচিবকে  (কর্মসংস্থান অনুবিভাগ) আহ্বায়ক করে। সাত সদস্যের প্রাথমিক বাছাই কমিটি প্রাপ্ত আবেদন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তালিকা প্রস্তুত করবে। সেই তালিকা আবেদনকারী সম্পর্কে অনাপত্তি/মতামতের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং ঋণ খেলাপি সংক্রান্ত অভিযোগ সম্পর্কিত তথ্যের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে এবং আবেদনকারী রিক্রুটিং এজেন্টদের বছরব্যাপী পারফরমেন্সের  বিষয়ে অনাপত্তি/মতামতের জন্য বিএমইটি, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মসংস্থান অনুবিভাগ এবং মনিটরিং ও এনফোর্সমেন্ট অনুবিভাগে পাঠানো হবে।

এরপর মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে গঠিত ১১ সদস্যের কমিটি চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তুত করবে। চূড়ান্ত তালিকা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিআইপি নির্বাচন কমিটির সুপারিশ নেওয়ার জন্য পাঠানো হবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সুপারিশসহ সেটি অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে। প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দেওয়ার পর গেজেট আকারে তালিকা প্রকাশ করা হবে। সিআইপি নির্বাচনের প্রক্রিয়া প্রতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ১৫ অক্টোবরের মধ্যে শেষ করার কথা বলা হয়েছে নীতিমালায়।

নির্বাচিত সিআইপি’রা প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকে এক বছর পর্যন্ত সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে সেই কার্ড প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে হবে এক সপ্তাহের মধ্যে।

রিক্রুটিং এজেন্টদের সিআইপি করার সরকারের উদ্যোগ প্রসঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ  বলেন,  ‘যারা রেমিট্যান্স পাঠান সাধারণত আমরা তাদের স্বীকৃতি দেই। কিন্তু কর্মীরা যাদের মাধ্যমে যান, তাদের মাধ্যমে না গেলে তো তারা রেমিট্যান্স পাঠাতে পারবেন না। মূলত বড় বড় রিক্রুটিং এজেন্ট যারা আছেন, তারা কিন্তু হাজার হাজার মানুষ বিদেশে পাঠান। এটা যদি আমরা স্বীকৃতি দেই, তাহলে তারা উৎসাহিত হবেন। এতে তারা বিদেশে গিয়ে আরও  ওয়ার্ক অর্ডার আনার চেষ্টা করবেন বা উদ্বুদ্ধ হবেন।’

সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন জনশক্তি রফতানিকারকরা। বায়রা’র সদ্য বিদায়ী কমিটির মহাসচিব শামিম আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের অনেকদিনের দাবি ছিল এই স্বীকৃতি। এই সম্মান জনশক্তি খাতে রিক্রুটিং এজেন্টদের কাজে আরও উৎসাহ জাগাবে। এর জন্য আমরা মন্ত্রণালয়, বিএমইটিসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।’